জাতীয়তাবাদী তাস, ওলি হাঁটলেন মোদির পথে

  • অনলাইন
  • বুধবার, ১৭ জুন ২০২০ ০১:৫২:০০
  • কপি লিঙ্ক

নেপাল সংসদের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভা যে বিল পাস করল, উচ্চকক্ষ জাতীয় পরিষদও অনতিবিলম্বে তাতে সম্মতি দেবে। নেপালের নতুন ম্যাপের আনুষ্ঠানিক পরিচিতি প্রাপ্তি তাই এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার। সে দেশের জাতীয় প্রতীকে (ন্যাশনাল এমব্লেম) এই মাসেই নতুন ম্যাপ চিত্রিত হওয়ার কথা। তা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ভারত-নেপাল সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়।

সেই অধ্যায়ের রচয়িতা হিসেবে নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী হতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী খড়্গ প্রসাদ শর্মা ওলি। জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেকে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যেতে চাইছেন। ভোঁতা করে দিয়েছেন দলের অভ্যন্তরে পুষ্প কুমার দহল প্রচন্ড ও মাধব নেপালের যৌথ চ্যালেঞ্জ।

যে দুই দেশের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া নেই, সীমান্ত চিহ্নিতকরণের দায়িত্ব প্রকৃতির, মানুষের বিচরণ অবাধ এবং সামান্য কয়েকটি আঞ্চলিক ধোঁয়াশা ব্যতীত সম্পর্ক মোটের ওপর মসৃণ ও শান্তিপূর্ণ, সেখানে এই সীমান্ত বিবাদ অবশ্যই অনভিপ্রেত। কিন্তু এটাও ঠিক, ইতিহাস কখনো ধরাবাঁধা ছকে প্রবাহিত হয় না। নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান, কমিউনিস্টদের উত্থান, নতুন সংবিধান রচনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কহানি এবং চীনের প্রভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন ম্যাপের চিত্রায়ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক নতুন বাঁকের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন দুই দেশের নেতৃত্বের বিচক্ষণতা ও চীনের উদারতার ওপর নির্ভরশীল।

কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরার ৩৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার দাবি নেপাল এত জোরালোভাবে আগে তোলেনি। ঐতিহাসিকভাবে এই এলাকার ওপর ভারতের দাবিই প্রাধান্য পেয়েছে। ১৮১৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নেপালরাজের সুগাউলি চুক্তি অনুযায়ী মহাকালী নদীর পূর্ব তীর নেপালের, পশ্চিম প্রান্ত ভারতের। দীর্ঘকাল এই অবস্থান অপরিবর্তিত। তর্কটা শুরু হয় নেপালি ব্যাখ্যায় মহাকালী নদীর উৎস চিহ্নিতকরণকে কেন্দ্র করে। নেপালের ব্যাখ্যা, ভারত যাকে উৎস মনে করে, মহাকালী সেখান থেকে সৃষ্ট নয়। কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরা ভারতের পিথোরাগড়ের অন্তর্গত নয়। অবস্থান নেপালের ধারচুলা জেলায়।

নেপালের এই দাবি মানা কঠিন, যেহেতু সুগাউলি চুক্তি ছাড়াও একাধিক দলিলে ওই তিন অঞ্চল ভারতের বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় চীনের তিব্বত অভিযানের সময় নেপালের অনুমতিক্রমে চীন সীমান্তে ভারত ১৭-১৮টি সামরিক ছাউনি বা চৌকি বসায়। ১৯৬৯ সালে নেপালের রাজা মহেন্দ্রর নির্দেশে প্রধানমন্ত্রী কীর্তি নিধি বিস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চৌকিগুলো হটাতে বলেন। তখন চৌকিগুলোর যে তালিকা নেপাল দিয়েছিল, তাতে কালাপানির নাম ছিল না। কেন ছিল না? নেপালের ব্যাখ্যা, ভারতের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ রাজা মহেন্দ্র অনুধাবন করেছিলেন। তাই ভারতের ‘অনুরোধে’ ভারতীয় ফৌজকে কালাপানির চৌকি রাখতে দিয়েছিলেন। কালাপানিই লিপুলেখ গিরিপথের প্রবেশদ্বার।

নেপালের এই ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য? ১৯৬৯ সালে ভারত সীমান্তে চীনের নজর প্রায় ছিলই না। কারণ, কালাপানির উত্তরাংশের গিরি-সীমান্ত বিবাদগ্রস্ত ছিল না। তা ছাড়া ১৯৬৬ থেকে শুরু চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সেই সময় ছিল তুঙ্গে। ওই সময় রাজা মহেন্দ্রকে কালাপানিতে চৌকি রাখার অনুরোধ ইন্দিরা গান্ধী কেন জানাবেন, তা বোধগম্য নয়। তা ছাড়া এর কোনো দলিলও নেই। ভারত কালাপানিতে ছিল অতীত চুক্তির নিরিখেই।

কালাপানি সীমান্ত বিতর্ক নতুন নয়। প্রশ্ন, হঠাৎ এখন নেপাল কেন এতটুকু এলাকা নিয়ে এভাবে কোমর কষে নামল? উত্তরটা রয়েছে নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলির চিরকালীন ভারতবিরোধী মনোভাব এবং সে দেশের শাসক দলে ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে।

দুই কমিউনিস্ট পার্টির মিলনের পর ওলি প্রধানমন্ত্রী হলেও তাঁর মূর্তিমান চ্যালেঞ্জার হয়ে দাঁড়ান মাওবাদী নেতা প্রচন্ড ও মাধব নেপাল। প্রশাসনিক নানা কারণে ওলি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিলেন। দাবি উঠছিল প্রধানমন্ত্রী বদলের। কোনোরকমে ঠেকা দিয়ে চলছিলেন প্রধানমন্ত্রী ওলি। ২০১৯ সালের নভেম্বরে দ্বিখণ্ডিত জম্মু-কাশ্মীরের যে ম্যাপ ভারত প্রকাশ করে, তাতে কালাপানির অন্তর্ভুক্তি ওলিকে ভারত-বিরোধিতার ধোঁয়ায় ধুনো দেওয়ার নতুন সুযোগ এনে দেয়। নেপাল প্রতিবাদ জানায়। আলোচনার প্রস্তাব দেয়।

পাঁচ মাস পর ৮ মে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানসসরোবর লিংক রোডের উদ্বোধন করেন। কষ্টকর দুর্গম মানসযাত্রা সুগম করতে ২০০৫ সালে ভারত এই রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। খরচ ধরা হয়েছিল ৮০ কোটি রুপি। যে রাস্তা ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল, ২০২০ সালে তার উদ্বোধন হয়। খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪০ কোটি রুপি। এই উদ্বোধনই হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় প্রধানমন্ত্রী ওলির। তত দিনে করোনার কারণেও তিনি জেরবার। বিক্ষোভের সামাল দিতে ভারত-বিরোধিতার চেনা ছকে আশ্রয় নিয়ে ওলি বললেন, ‘চীন ও ইতালির কোভিড ভাইরাসের চেয়ে ভারতের করোনা আরও মারাত্মক।’ এরপরেই নতুন ম্যাপ তৈরির সিদ্ধান্ত প্রচন্ড ও মাধব নেপালের আগ্রাসনে রাশ টানলেন। ওলি আপাতত বেশ কিছুদিন নিরাপদ।

এখন ভারত কী করবে? ম্যাপ–সংক্রান্ত উদ্যোগের বিরোধিতা ভারত শুরু থেকেই করছে। সংসদের নিম্নকক্ষে বিলটি পাস হওয়ার দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব যে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন, তাতেও সেই পুরোনো কথার পুনরাবৃত্তি। যেমন ‘একতরফা এই মানচিত্র তৈরি গ্রহণযোগ্য নয়। নেপালের দাবির সমর্থনে কোনো ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। সীমান্ত সমঝোতা এতে বিঘ্নিত হবে।’ কূটনৈতিক পরিভাষার আতশি কাচের তলায় রাখলে বোঝা যায়, বিবৃতিটি যথেষ্ট নরম। স্পষ্টতই, ভারত এমন কিছু করতে চায় না, যা সম্পর্ক আরও বিষিয়ে তোলে। সংবিধান রচনার সময় যা হয়েছিল, ভারত-বিরোধিতার তীব্রতা যেখানে পৌঁছেছিল, ম্যাপ রাজনীতি সেই পুরোনো দিন ফিরিয়ে আনুক, ভারত চায় না। ভারত বিলক্ষণ জানে, চীন কীভাবে চাদর বিছিয়ে রেখেছে এবং নেপালের রাজনীতি কতটা চীননির্ভর।

নেপালে ভারতের দুই সাবেক হাইকমিশনার শ্যাম সরণ ও দেব মুখোপাধ্যায় মনে করেন, ভারতকে খুবই সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দাবিতে অনড় থেকে নেপালি জাতিসত্তা আহত না করে সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। ভারত বেশ বুঝেছে, খেলাটা হাতের বাইরে চলে গেছে। নেপালের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে নতুন ম্যাপের স্থান হলে তা সংশোধনের আর কোনো উপায় থাকবে না। নেপাল সেই পথে দ্রুত এগোচ্ছে। ঘটনাপ্রবাহকে কম গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া ভারতের দ্বিতীয় কোনো উপায় তাই নেই।

নরেন্দ্র মোদি বুঝেছেন, তাঁর দেখানো পথেই হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী ওলি। খেলছেন জাতীয়তাবাদী তাস। অতঃপর, ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও তার মানচিত্র আরও এক ভিন্ন পরিচয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় অবস্থান করবে। পাকিস্তান ও চীনের মানচিত্রে কাশ্মীর বহুখণ্ডিত। নেপালের মানচিত্রও ভারতের মুখ ভার করবে।

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি


বাংলাদেশ জমিন/ সংবাদটি শেয়ার করুন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য