গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহিয়ান"। কবিতার প্রতিপাদ্যকে অন্তরে ধারণ করে নিজেদের ঝুঁকি রয়েছে জানা সত্যেও ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মা এবং মেয়ে প্রতিবেশীদের করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি সুতি কাপড় কিনে মাস্ক তৈরি করে অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে বিনামূল্যে বণ্টন করছেন বাড়িতে বাড়িতে বাড়িতে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রায় তিনশত গ্রামবাসীকে মাস্ক বিতরণ করেছেন তারা। শিক্ষক হিসাবে মা এবং মেয়ের মানবিক কাজের জন্য ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে গোটা এলাকাজুড়ে।
উপজেলার চুমুরদি ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামে মা ও মেয়ের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, মা জেসমিন আক্তার পূর্ব সদরদী এবং মেয়ে শারমীন রহমান সুইট ঘারুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। জেসমিন আক্তারএকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তার স্বামী ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা। প্রায় ১৮ বছর আগে মারা গেছে স্বামী। প্রয়াত স্বামীর কাছ থেকেই মানবিকমন্ত্রর চেতনা সৃষ্টি হয়েছিল তার।
একইভাবে নিজের ৪ সন্তানকেও পিতার আদর্শের মত করে মানুষের পাশে দাঁড়াবার চেতনা সৃষ্টিসহ সুশিক্ষিত করে তুলেছেন শিক্ষিকা জেসমিন আক্তার।
বড় মেয়ে শারমিন রহমান সুইট শিক্ষিক। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক হলেও তার লেখা প্রথম গ্রন্থ কয়েদি নম্বর-৩৩২ সদ্য সমাপ্ত একুশের গ্রন্থ মেলায় পাঠকের কাছে প্রিয়তা লাভ করেছে। তার মায়ের ভাষ্যমতে ভাঙ্গার সন্তান আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চলচিত্রকর প্রয়াত তারেক মাসুদকে নিয়ে নতুন বই প্রকাশনার কাজ শুরু করেছে। আগামী বই মেলায় পাঠকের হাতে তা পৌঁছে যাবে তারা আশাবাদ ।
মেজ মেয়ে শ্রাবন্তী রহমান। লেখাপড়া করছেন দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বলে খ্যাত ফরিদপুর সরকারী রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। ছোট মেয়ে মারিয়া রহমান নীদ। সে ঢাকা ইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একমাত্র ছেলে তরিকুল ইসলাম ঢাকা ব্রাক ইউনিভার্সিটিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কোর্স করছেন।
সাধারণ জনগণের ভাষ্যমতে, চুমুরদী ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামের মৃত লুৎফর রহমানের স্ত্রী জেসমিন আক্তার এককথায় রত্নগর্ভা মা। স্বামীর অবর্তমানে নিজের চারটি সন্তানকে তিনি সৎ ও মেধাবী হিসাবে গড়ে তুলেছেন ঠিক তেমনি আবার মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন মানুষের দুঃসময়ে পাশে থেকে কাজ করার। দেশের করোনা ভাইরাস প্রাক্কালে প্রতিবেশীদের সচেতন করার পাশাপাশি নিজেরাই মাস্ক তৈরি করে বিনামূল্যে তা বিতরণ করার ঘটনা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রতিবেদক আজ সকালে শিক্ষিকা জেসমিন আক্তারের বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, মা-মেয়ে একটি মেশিন নিয়ে মাস্ক তৈরি কাজে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় তাদের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। গত কয়েকদিনে ৫ জনের মৃত্যুর খবর ব্যথিত করেছে মা ও মেয়ের হৃদয়। যদিও ভাঙ্গায় এখনও কোন করোনা রোগী সনাক্ত হয় নি। এরপরেও সীমিত আয়ের থেকে প্রতিবেশীদের জন্য কিছু করতে হবে? এমন চেতনায় ছিল মা ও মেয়ের।
বিনামূল্যে মাস্ক পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিবেশী সুমি আক্তার নিজের অভিমত প্রকাশ করেন এভাবে, আমাদের প্রতিবেশী দুই শিক্ষিকার মত যদি সবার মনে নিজেদের পাড়া প্রতিবশীর চেতনা সৃষ্টি হয় তাহলে আমরা সবাই করোনা ভাইরাস থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পারবো। তিনি আরও বলেন, মাস্ক নিজেরা তৈরি করার পর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শুধু বিলি করে তারা ক্ষান্ত নয়। এরপর কিভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে হলে ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে, রুমাল বা টিস্যু ব্যবহারসহ বিভিন্ন নিয়মাবলী সম্পর্কেও সচেতন করছেন শিক্ষিকা মা ও তার মেয়ে।
শারমিন রহমান সুইট বলেন, ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি। কিন্তু মা আমাদের বাবার অভাব পূরণ করেছেন। মা আমাদের আদর্শ। দেশে করোনা ভাইরাস প্রভাব? এই নিয়ে মায়ের সাথে আলাপ করি। মায়ের ইচ্ছেতে কাজ শুরু করি। আমরা জানি গ্রামের অনেকেই জানে না করোনা ভাইরাস থেকে কিভাবে নিজেকে সুরক্ষিত করতে হবে? হাঁচি বা কাশি আসলে কিভাবে দিতে হবে? এরপর আমাদের সীমিত আয়ের কিছু অংশ বাঁচিয়ে বাজার থেকে সুতি কাপড় কিনে মাস্ক তৈরি করে তিন শতাধিক গ্রামবাসীর মধ্যে বিতরণ করি।




.jpg)

মন্তব্য