ঈদুল আজহার সময় পরিবেশ দূষণ রোধ ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ইসলামী শরিয়তে নির্ধারিত স্থানে কোরবানি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নির্ধারিত স্থানে কোরবানি করা উত্তম। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহের নিকটবর্তী স্থানে পশু কোরবানি করতেন। ফিকহের কিতাবগুলোতে মাজবাহ নামে একটি বিশেষ স্থানের ধারণা পাওয়া যায়, যা শহর বা বসতির এক প্রান্তে হতো এবং যেখানে সমাজের পশুগুলো একত্র করার পর জবাই দেওয়া হতো।
যেমন বলা হয়েছে, এমন অন্ধ, লেংড়া ও খোঁড়া পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ হবে না, যা মাজবাহ বা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না। (আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, পৃষ্ঠা ২৬৪৮)
অন্যত্র বলা হয়েছে, ঈদের জামাতের পূর্বে জবাইয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে পশু পাঠিয়ে দেওয়া দোষের নয়। (হেদায়া, কোরবানি অধ্যায়)
নবীজি (সা.)-এর আমল
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহে পশু জবাই বা নহর করতেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৫৮৯)।
আলোচ্য হাদিসে ‘করতেন’ শব্দটি (আরবিতে ‘কানা’) তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা তা ধারাবাহিকতা ও অভ্যাস বোঝায়। তবে ইসলামী আইনজ্ঞরা বলেন, যেকোনো স্থানে কোরবানি করলে তা শুদ্ধ হয়ে যাবে।
সাধারণ মানুষের করণীয়
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে মুলকিন (রহ.) বলেন, নবীজি (সা.) ঈদগাহে পশু কোরবানি করতেন দুটি উদ্দেশ্যে : এক. মানুষকে কোরবানির পশু জবাই বা নহর করার পদ্ধতি শেখাতে, দুই. কোরবানির প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে।
(আত-তাওজিহ)
শায়খ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন (রহ.) বলেন, এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইমামদের জন্য ঈদগাহে পশু কোরবানি করা উচিত। তবে নামাজের স্থানে নয়; বরং তার কাছাকাছি স্থানে পশু কোরবানি করবে। কেননা সেজদার স্থানে নাপাক রক্ত প্রবাহিত করা জায়েজ নয়। নবীজি (সা.) ঈদগাহ থেকে বের হয়ে (নিকটবর্তী স্থানে) পশু কোরবানি করতেন। (শরহুল বুখারি)
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) উক্ত হাদিসের আলোকে বলেন, একইভাবে ঈদগাহে পশু কোরবানি করা মুস্তাহাব।
(ফয়জুল বারি)
উল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়, কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে পশু কোরবানির জন্য স্থান নির্ধারণ করার অবকাশ ইসলামী শরিয়তে আছে। বিষয়টি শরয়ি বিধানের অনুকূল। তবে কাউকে নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি করতে জোর প্রয়োগ করা উচিত হবে না। কেননা শরিয়ত তাকে যেকোনো স্থানে পশু কোরবানি করার অবকাশ দিয়েছে এবং ব্যক্তির গ্রহণযোগ্য অপারগতাও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি করতে, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলতে এবং রোগ-ব্যধি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করতে পারে, পারে সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে।
পরিচ্ছন্নতা সবার দায়িত্ব
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। আল্লাহ পরিচ্ছন্নতাকে ভালোবাসেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)
কোরবানির সময় ব্যক্তির অসচেতনতার কারণে অন্যরা কষ্ট পায়। একজন মুমিন কখনো অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারে না। সে যত্রতত্র ময়লা ফেলে পরিবেশ দূষণ করতে পারে না। কেননা রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা অভিশাপকারী দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), অভিশাপকারী কাজ দুটি কী? তিনি বলেন, যে মানুষের চলাচলের রাস্তায় কিংবা গাছের ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫)
এ ছাড়া নবীজি (সা.)-এর নির্দেশ হলো, ‘তোমরা তোমাদের ঘরের আঙিনাগুলো পরিচ্ছন্ন রাখবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৭৯৯)






মন্তব্য