আমাদের আগামীর স্বপ্ন অবশ্যই সার্থক হবে

  • শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
  • মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১ ১২:২০:০০

২০২০ চলে গেছে। প্রকৃতির নিয়মেই সবকিছু বিদায় নেয়। মানুষ যেমন বিদায় নেয়, তেমনি করে সময়ও বিদায় নেয়। মানুষ চলে গেলে আর ফিরে আসে না। সময় চলে গেলে সেও আর ফিরে আসে না। মানুষ চলে যায়। সবাইকে চলে যেতে হয়। চলে যেতে হবেই। প্রকৃতি কোনো কিছুকে চিরদিনের জন্য ধরে রাখতে পারে না। তারপরেও নদী মরে গেলে যেমন তার চলার সরল রেখা রেখে যায়। মানুষ চলে গেলে রেখে যায় তার কর্ম সমূহ। সময় চলে গেলে তার দিন ক্ষন মাস বৎসরের মাধ্যমে তার স্মৃতি চিহ্ন রেখে যায়। সময়কে আমরা ভাগ করে নেই দিন, ক্ষন, মাস ও বৎসরের রূপ রেখায়। খুব সম্ভব আমাদের যৌবনের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুন, তাঁকে যৌবনের প্রিয় কবি বলছে কেন, যত দিন আমাদের প্রজম্মের ছেলেমেয়েরা বেঁচে থাকব, ততদিন তিনি আমাদের প্রাণের কবি হয়ে থাকবেন। নির্মলেন্দু গুনের এক কবিতায় মনে হয় এরকম পড়েছিলাম।

তিনিও তার এক কবিতায় বলেছিলেন, সময়কে আমরা এভাবেই ভাগ করে নেই। এবার আসা যাক মূল কথায়। ২০২০ সাল যেমন আমাদের কাছে তমসায় আবৃত বিভীষিকার মত এসেছিল, তেমনি করে ২০২০ সাল আমাদেরকে হাতে ধরে শিখিয়েছে অনেক কিছু। যা আমরা গত জীবনে পার করা সময়ে শিখতে পারিনি। আবার ২০২০ সাল আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়ে গেছে। আমাদেরকে একটি কথা মানতেই হবে। ২০২০ সাল আমাদেরকে আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, মানুষ কখনো পরাজিত হয় না। মানুষ পরাজিত হতে পারে না। যত বড়ই বিরুদ্ধ শক্তি মানুষের সামনে তার কালো হাত মেলে ধরুক না কেনো, মানুষে সেই বিরুদ্ধ শক্তির কাল হাত ভেঙ্গে চুরমার করে তার আপন শক্তিকে জয়ের রথে তুলে দিয়ে আপন গন্তব্যে নিয়ে গেছে।

বিরুদ্ধ শক্তি যতই ভয়ানক হোক না কেন, সে বিরুদ্ধ শক্তি মানুষের প্রাণের শক্তির কাছে হেরে গেছে বার বার। মূল কথা হল কোনো বিরুদ্ধ শক্তিই মানুষের চলার গতিকে রুদ্ধ করতে পারে না। কোভিড-১৯ এর তান্ডবে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন মানুষ শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় বলেছে, আমরা ঘরে বসে থাকব না। আমাদেরকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। কাজ না করলে বাঁচা যাবে না। কেননা কাজ করলেই পকেটে পয়সা কড়ি আসে। সেই পয়সা-কড়ি দিয়েই বৌ-বাচ্চা নিয়ে মানুষ ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ কাজ করলে চলমান অর্থনীতি সচল হয়। দেশের চলমান অর্থনীতি সচল হলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থাও শক্তিশালী হয়। আমরা সবাই জানি মানুষের জীবন নদীর মতো প্রবাহমান। 

কেউ যদি তা না মানেন, তাতে নদীর মতো প্রবাহমান জীবনের কিছু যায় আসে না। নদীকে যেমন কোনো কিছু আটকে রাখতে পারে না, তেমনি করে মানুষের জীবনের গতিকে কোনো কিছু বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। নদীর স্রোত কোথাও বাধা ফেলে নদীর স্রোত আটকে থাকে না। বাধা প্রাপ্ত নদীর স্রোত বাধাকে অতিক্রম করে তার গন্তব্যের দিকে চলে যায়। মানুষের জীবনকে যদি কোথাও কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধ শক্তি এক জায়গায় আটকে রাখতে চায়, মানুষ তখন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। সেই বিদ্রোহী মানুষ সকল বিরোধী শক্তিকে ভেঙ্গেচুরে তার আপন বিজয়ের ধ্বনি ঘোষণা করে থাকে। নদী কোথাও আটকে গেলে নদী মরে যায়। তেমনি করে মানুষের জীবনও তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন মানুষ তার মন থেকে মরে যায়। মানুষ মন থেকে মরে গেলে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। নদী তার স্রোত হারিয়ে মরে গেলে তার সকল প্রাণ শক্তি হারিয়ে মরা খালে পরিনত হয়।
 
২০২০ সাল আমাদেরকে দিয়েছে অনেক কিছু। আমাদের চিন্তা শক্তিকে এক লাফে হাজার হাজার মাইল দূরে নিয়ে গেছে। প্রগতির অগ্রযাত্রাকে আরও গতিময় করেছে মানুষের চিন্তা শক্তি মসৃন হওয়ার জন্যে। মানুষ চিন্তা করে বুঝেছে মানুষের চেহারা মুখের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সকল মানুষ একই সমস্যার সম্মুখীন। আজ কোভিড-১৯ ভাইরাসের মত মহামারী কিংবা প্রাণঘাতী সমস্যায় ছোট বড় ধনী গরীব রাষ্ট্র সমূহের বসবাসকারী সকল মানুষেই আক্রান্ত। এই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে মানুষ বুঝতে পারছে সকল রাষ্ট্রের মানুষই মহাবিপদে আছে। শুধু আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোর মানুষই নয়, সকল রাষ্ট্রের মানুষই একটা বিষয় অনুধাবন করতে পারেছে, আর তা হল প্রাকৃতিক সমস্যা যখন মানুষের মধ্যে আসে, তখন সমস্ত পৃথিবীর মানুষ একই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্যের দ্বারস্ত হয়ে থাকে। মানুষের শরীরের বর্ণ থেকে শুরু করে কোন রকমের ভেদাভেদ মানুষের ঐক্যকে ভাঙ্গতে পারে না।

 আজকের পৃথিবী কোভিড-১৯ ভাইরাস আক্রান্ত মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে মানুষ বুঝতে পারছে মানুষের সামগ্রীক ঐক্য ছাড়া এই প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। মানুষের এই শিক্ষা মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে অহংকার কিংবা অস্বাভাবিক ঐশ্চর্য্য মানুষকে মরণঘাতী কোনো ভাইরাস বা অন্য কোনো সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে না। তাই দেখা যায় আজ পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এক হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিকরা কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গবেষনাগারে বসে রাতদিন পরিশ্রম করে কাজ করে যাচ্ছেন মানুষকে রক্ষা করার জন্য। আজ ইউরোপের গবেষনাগারে কিংবা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের গবেষনাগারে তৈরি হওয়া ভ্যাকসিন কেবল ইউরোপের মানুষকেই রক্ষা করবে না কিংবা পৃথিবীর যে প্রান্তের বৈজ্ঞানিকরাই মরণঘাতী কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রতিষেধক আবিষ্কার করুন না কেন, তা কেবল আবিষ্কার হওয়া প্রান্তের মানুষকেই রক্ষা করবে না, বরং সমগ্র পৃথিবীর সকল মানব জাতিকেই রক্ষা করবে। 

কথায় বলে চোরে না শুনে ধর্মের বানী। মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখেছে মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর মানুষ সকল মানবতাকে ভুলে রাষ্ট্রের সম্পদ লুন্ঠন করার জন্য উন্মাদ নৃত শুরু করে দিয়েছে। কোভিড-১৯ ভাইরাস পরীক্ষার নামে ভদ্রবেশী এক ধরনের চোর বাটপার (যারা শিক্ষিত কিংবা উচ্চ পদে কর্মরত) কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষের শরীরে আছে কিনা, তা পরীক্ষা না করেই মানুষকে পজিটিভ কিংবা নেগেটিভের রির্পোট দিতে থাকেন। এই শ্রেণীর লোকেরা মানুষের অসহায়ত্বকে নিজেদের লাভ-লোকসানের মাধ্যম হিসাবে ধরে নিয়ে লুটে নিয়েছে মানুষের পকেটের টাকা। কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষকে শিখিয়েছে মানুষের চরিত্র সংকট কালে কেমন হয়ে থাকে কিংবা কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষকে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছে, মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হতে গেলে মানুষের মধ্যে মানুষের সুচরিত্রটুকু বিরাজমান থাকতে হয়। 

যারা বলে থাকেন ২০২০ সাল শুধু আমাদেরকে অন্ধকারের দিকেই নিয়ে গেছে, কেন জানি মনে হয় তাদের এই কথাটি সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব এসেছে বলেই, পৃথিবীর বিজ্ঞানের গবেষনাগারে নতুন সৃষ্টির চিন্তা চেতনা মানুষের মেধ্য ও মননকে প্রগতির নতুন দিকে ধাবিত করেছে। মানুষ অনুধাবন করেছে বিপদ কালে মানুষকেই মানুষের পাশে যেতে হয়। এক শ্রেণীর মানুষ অন্ধকারে বসে যতই মানুষের বিরুদ্ধে কিংবা জগৎ সংসারের বিপরীতে ষড়যন্ত্র করে যাক না কেন, ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই সমষ্টিগত মানুষের শুভ চিন্তার ঐক্যের মিছিলকে মাঝ পথে ছত্রভঙ্গ করতে পারে না। সমষ্টিগত মানুষের ঐক্যবদ্ধ আলোর মিছিল ঠিকই তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যারা কোভিড-১৯ ভাইরাসকে পুঁজি করে মানুষের পকেটের টাকা লুন্ঠন করতে উলঙ্গ নৃত্য শুরু করেছিলেন, তারা কেবল মানুষের ধিক্কার আর ঘৃণাটুকুই পেয়েছেন। যারা কোভিড-১৯ ভাইরাসকে পুঁজি করে রাষ্ট্রের টাকা এবং অসহায় গরীব মানুষের পকেটের টাকা চুরি করতে ব্যস্ত ছিলেন, তাদেরকে মানুষ চোর বাটপার ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। 

কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব কালে সাধারণ মানুষ সাময়িক কালের জন্য ভীত হয়ে পড়লেও, এক সময় কিন্তু মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সাহসী মানুষের দল সাময়িক কালের সকল ভীতি ও বিভ্রান্তি কাটিয়ে কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিষাক্ত ছোঁবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাহসী মনোবৃত্তি নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। মানুষের মেধা ও বুদ্ধিমত্তার কাছে কোভিড- ১৯ ভাইরাসের বিষাক্ত নীল ছোঁবল একদিন পরাজিত হবে, মানুষ তা অব্যশই বিশ্বাস করে। সাহসী মানুষের বিশ্বাসের কর্মকান্ড মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যাবে, তা ইতিবাচক মানুষের দল সরল মনে বিশ্বাস করে। 

২০২০ সাল কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব লীলায় কেটে গেছে। আমাদের জীবন যাপনের আকাশে ২০২১ এর উদীয়মান সূর্য্য নতুনের বার্তা নিয়ে তার আলোক রাশি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ২০২১ এর সূর্য্যরে পবিত্র আলোক রেখা আমাদের চলমান কোভিড-১৯ ভাইরাসের আতংকের দুষ্ট ছায়া দূর করে, মানুষের জীবন যাপনকে অবশ্যই আবার স্বাভাবিক করে তুলবে। এই আশা নিয়ে পৃথিবীর মানুষ ২০২১ এর যাত্রাপথের সঙ্গী হয়েছে।

তাই বলছিলাম, ২০২০ সাল যেমন আমাদেরকে আতংকের মাঝে ফেলেছে, ঠিক তেমনি করে ২০২০ সালই আমাদেরকে হাতে ধরে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমরা পৃথিবীর মানুষ ২০২০ এর সকল শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২১ এর আলোক রাশিতে একাত্ম হয়ে আবার পবিত্র হয়ে উঠব, এই বিশ্বাস যেন আমরা মনের মধ্যে রাখি। বিশ্বাস হারালে মানুষের আর কিছুই থাকে না। কথাটা যেন আমরা পৃথিবীর মানুষ সকল সময় মনের গভীরে লালন করি। ২০২১ সাল অবশ্যই আমাদের শুভ স্বপ্নের সফলতার পথ দেখাবে।

লেখক: শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল, আইনজীবী, কবি,গল্পকার, হবিগঞ্জ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য