নিক্সন চৌধুরী ও বাংলাদেশের গণমুখী রাজনীতি সমাচার

  • রুদ্রপীড় আহমেদ
  • শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২০ ১০:২২:০০

জনপ্রিয় সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী কিভাবে কথা বলেন সেটা তার বিভিন্ন সময় প্রকাশিত ভিডিওর বক্তব্যগুলো শুনলেই বোঝা যায়। সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষায় সাধারণ জনতার উপযোগী করে কথা বলেন তিনি। বক্তব্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রায়ই আঞ্চলিক অনেক নির্ভেজাল শব্দের আশ্রয় নেন। কখনো কখনো রস সঞ্চার নিমিত্তে অশ্রাব্য শব্দের ব্যবহারও করেন দেখা যায়। কর্মীর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া তার রাজনীতির মূল অস্ত্র। কারন একজন নেতার মূল শক্তিই হলো তার বিশ্বস্ত কর্মীবাহিনী। কর্মী যখন জানে তার নেতা যেকোনো পরিস্থিতিতে পাশে এসে দাড়াবে তখন ঐ কর্মীর কোনো পিছুটান থাকে না, এমনকি নেতার জন্য জীবনও দিয়ে দেবে। বলা বাহুল্য, নিক্সন চৌধুরী তার সকল কর্মীর মধ্যে এই বিশ্বাসটি তৈরি করতে পেরেছেন। নেতা এবং কর্মীর সম্পর্কটি বিশ্বাস ও ভালোবাসার। চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক আছে বটে। তবে শুধু পাওয়া এবং দেওয়ার সম্পর্কটি সংজ্ঞাগতভাবে রাজনৈতিক নয়, বাণিজ্যিক। প্রকৃত রাজনৈতিক সম্পর্ক চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্কের অনেক উর্ধ্বে।

এটা গেলো রাজনীতিকদের দিককার কথা। অন্যদিকে আমলাদের ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমলারা অধীনস্তকে চাকরির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করে। উর্ধ্বতন অধঃস্তনের সম্পর্কটি ইদুর-বিড়াল খেলার মত। কেউ কাউকে ভালোবাসে না, বিশ্বাস করে না, শুধু নিয়মমাফিক দায়িত্ব পালন করে। এই যে নিয়মমাফিক দায়িত্ব পালন করে, এই নিয়মটি তৈরি হয় রাজনীতিকদের হাতে। রাজনীতিকগণ দেশের কল্যাণার্থে যেসব আইন ও বিধির প্রবর্তন করেন সেসব আইন ও বিধির আলোকেই আমলাদের কাজের ধারাটি চলমান থাকে। রাজনীতিকরা নীতি নির্ধারক, আমলারা সেই নীতির ধারক ও বাস্তবায়নকারী। ফলে আমলাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক ব্যাপার না থাকলেও তাদের সম্পর্ক চাওয়া-পাওয়ার আলোকেই আবর্তিত হয়। পদোন্নতি, পোস্টিং, বদলী, বরখাস্ত ইত্যাদি বিষয়ের একটি স্বার্থগত সম্পর্ক দ্বারা আমলারা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। এই সম্পর্কের মধ্যে কোনো শ্রদ্ধা-ভালোবাসার বালাই নেই।

গুণীজন আহমদ ছফা বলেছিলেন, আমলারা নিজেরাই একটি দল। সরকারি দল--বিরোধী দলের বাইরে তৃতীয় আরেকটি দল হয়ে আমলারা যে রাজনৈতিক আচরণ করার সুযোগ পায় সেটি মূল ধারার রাজনীতির অন্তর্গত দুর্বলতার সুযোগে পায়। আমলাদের পছন্দ না হলে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে এরা সরকারকে ক্ষমতা থেকেই নামিয়ে দেয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে এসেও বাংলাদেশে এই ধারার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের টানা এক যুগ ধরে ক্ষমতায় থাকার কারনে আমলারা ভেতরে ভেতরে এতটাই সুসংহত হয়েছে যে, তারা এখন প্রকাশ্যে রাজনীতিতে নাক গলাচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে রাজনীতিকদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে নোংরা খেলায়ও মেতে উঠছে। 

আমলাদের দলগত ক্রিয়াকর্মের সর্বশেষ একটি নমুনা মঞ্চায়িত হলো ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসনের একটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সমর্থণ দিয়েছিলেন ঐ এলাকার সাংসদ নিক্সন চৌধুরী। নির্বাচনের দিন অস্বাভাবিক বেশি সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ভোটকেন্দ্রে আতংক তৈরি করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করে নিক্সন চৌধুরীর হয়তো মনে হয়েছিলো, নির্বাচনে নৌকা প্রতীককে পরাস্ত করার একটি নীল নকশা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে কেউ। নিক্সন চৌধুরী এমপি হিসেবে পরপর দুইবার নির্বাচিত হতে গিয়ে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখতে যে পরিশ্রম আর সতর্ক পাহারা দিতে বাধ্য হয়েছেন, এবারের উপজেলা নির্বাচনে ঠিক সেই কাজটাই করছিলেন মনে হয় আমাদের। নিক্সন চৌধুরীর প্রতিপক্ষ কোনো হেলাফেলার মতো ব্যক্তি নয়, স্বয়ং একজন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। ফলে নিক্সন চৌধুরীকে নির্বাচনে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এটাই স্বাভাবিক।

বিগত সাত বছর ধরে এমপি থাকার সুবাদে এলাকার মানুষের সাথে আত্মার সম্পর্ক বিনির্মাণের পাশাপাশি ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়ে জনপ্রিয়তার চূড়ায় অবস্থান করছেন তিনি। এই আসনের জনগণ নিক্সন চৌধুরী যেদিকে, সেদিকেই দলবেধে ঝুঁকে পড়ে। ফলে চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ইতিপূর্বে কেউ জয়লাভ করতে না পারলেও এবারই প্রথম নিক্সন চৌধুরীর সমর্থণে ইতিহাস ঘটিয়ে নৌকার প্রার্থী বিজয়লাভ করে। আর নৌকা প্রতীকের প্রতি আজন্ম ভালোবাসা নিয়েও নিজে সেই প্রতীকে নির্বাচন করতে না পারার দুঃখ হয়তো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকায় সমর্থণ দিয়ে ভুলতে চেয়েছিলেন। নৌকার প্রার্থী কাউসার মিয়া নিজে নিক্সন চৌধুরীর সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়ে সেই সুযোগটি তৈরি করে দেন। ফলে নিক্সন চৌধুরীর মধ্যে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস আর উৎসাহের প্রকাশ দেখতে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচনের দিন ফলাফল ঘোষণার প্রায় পরপরই চরভদ্রাসন উপজেলায় ছুটে গিয়ে কর্মীদের সাথে তাৎক্ষণিক মতবিনিময় করে যেসব আবেগী কথাবার্তা বলেন, সেসব যে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করার বিষয় হতে পারে, তা যেন জেনেও তিনি না জানার ভাণ করেন। এতদসংক্রান্ত আচরণবিধি একজন সাংসদ হয়ে নিক্সন চৌধুরীর না জানার কথা নয়। তবুও তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। এই আহাম্মকি তার নৌকা নিয়ে অতি আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। সে সময়কার ভিডিওতে দেখা যায়, নিক্সন চৌধুরী একদিকে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন নৌকার বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানোর জন্য, আরেকদিকে কর্মীদেরকে কারো সাথে দুর্ব্যবহার করতে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে কড়াভাবে নিষেধ করছেন। জনতার ক্ষোভকে প্রশমিত করে দেয়ার আশ্চর্য কৌশল বটে।

ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু পরেরদিন একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়ে যায় ব্যাপারটি। অডিও রেকর্ডটি চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে নিক্সন চৌধুরীর উত্তপ্ত বাক্যবাণ সংক্রান্ত। বাক্যবাণ বলছি কারন কথা শুধু নিক্সন চৌধুরীই বলছেন, ইউএনও শুধু জি স্যার জি স্যার করছেন, তাই এটি বাক্যবিনিময় নয়। আমরা এই অডিও রেকর্ড থেকে কিছু নতুন বিষয় অবগত হলাম। ভোটগ্রহণের দিন সকালবেলা নিক্সনের একজন বিশ্বস্ত কর্মী ভাঙ্গার এসিল্যান্ড কর্তৃক ধৃত হবার খবরে ক্ষিপ্ত হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ফোন করেছিলেন নিক্সন চৌধুরী। অডিও থেকে নিক্সন চৌধুরীর মেজাজের যে অবস্থা বোঝা যায় তাতে মনে হয় নিক্সন চৌধুরী আগে থেকেই ঐ এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত ছিলেন। হয়তো আগে তিনি এসিল্যান্ডকে ফোন দিয়েছেন। এসিল্যান্ড তার ফোন রিসিভ করেনি দেখে চরভদ্রাসনের ইউএনওকে ফোন করেছেন। ভাঙ্গার এসিল্যান্ডকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার বিশ্বস্ত কর্মীকে ছেড়ে দেয়ার আলটিমেটাম দেন, নইলে নিজে এসে উপজেলা ঘেরাও করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। এই ধরনের আলাপ রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আমলাদের হরহামেশা হয়। সেগুলো মিডিয়ায় আসে না। আমরা শুধু অনুমান করে নিই। কিন্তু এবার যখন প্রকাশ্যে এসেছে, আমরা এবার পুরো ব্যাপারটা বোঝার সুযোগ পেলাম। 

আলাপচারিতা শুনে মনে হচ্ছে, চরভদ্রাসনের ইউএনওর উপর নিক্সন চৌধুরীর বিশেষ ভরসা এবং বিশ্বাস রয়েছে। তার ক্ষোভ ভাঙ্গার এসিল্যান্ডের উপর। এসিল্যান্ডকে সরাসরি না পেয়ে চরভদ্রাসনের ইউএনওর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং হুমকি প্রদর্শন করছেন। কথাগুলো তিনি ঐ এসিল্যান্ডকেই বলছেন। কিন্তু শ্রোতাটি অন্য কেউ, অর্থাৎ চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এসিল্যান্ড কর্তৃক নিক্সনের কর্মী আটকানোর কারন হিসেবে জানা গেলো, ঐ কর্মী নাকি এসিল্যান্ডের সামনে সিগারেট টানছিলো। আমরা জানি প্রকাশ্যে সিগারেট টানা অর্থাৎ জনকোলাহলে ধুমপানের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইন আছে। তিনদিনের জেল অথবা পঞ্চাশ টাকা জরিমানা। এসিল্যান্ড ঐ কর্মীকে ধুমপানবিরোধী আইনের বলে আটক করলো না। তার কাছে নাকি ঐ কর্মীর আচরণকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হয়েছে! ধুমপান করলে একজনকে উদ্ধত মনে করার মুরব্বীয়ানা দেখানোর জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়ার কোনো আইন আছে কিনা আমরা জানি না। তবে এই ঘটনা থেকে একটি জিনিস বেশ স্পষ্ট যে, আমলারা কারো ঔদ্ধত্য বরদাশত করতে ইচ্ছুক নয়। একজন এসিল্যান্ড প্রায় শুরুর দিককার আমলা। সবে চাকরিতে প্রবেশ করেছে। এখনই যদি পাবলিকের ধুমপানকে তার কাছে পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের চেয়ে ঔদ্ধত্য দেখানোর বিষয় মনে হয়, ভবিষ্যতে তার মনে হওয়ার ক্ষেত্র আরো কতদিকে বিস্তৃত হবে তার আন্দাজ করা সত্যিই মুশকিল।

যাহোক, অডিওটি ফাঁস হবার কল্যাণে আমলাদের মনের গতি বোঝার খানিকটা সুযোগ হয়েছে আমাদের। এরপরের কাহিনী আরো ভয়াবহ। সেদিন বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিক্সন চৌধুরী অডিওর কন্ঠটি তার নয় এবং এতে সুপার এডিট করা হয়েছে বলে দাবি করার মাত্র তিন ঘন্টার মধ্যে চরভদ্রাসন উপজেলার ইউএনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বক্তব্য দিয়ে জানালেন যে, অডিওর ভয়েসে কোনো এডিট করা হয়নি। একজন জনপ্রতিনিধির সাথে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবার চেষ্টা এখানেই শেষ নয়। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার সার্ভিস এসোসিয়েশন নামে জাতীয় পর্যায়ের পেশাগত সংগঠনটি কেন্দ্রীয়ভাবে বিবৃতি দিয়ে একজন নারী ইউএনওর সাথে অশালীন ভাষায় কথা বলার জন্য মাননীয় সংসদ সদস্যের বিচার দাবী করে! এই পর্যন্ত এসে আমাদের মনে হতে পারে পুরো ঘটনাটি ছিলো পূর্বপরিকল্পিত এবং একজন কর্মীমুখী-গণমুখী রাজনৈতিক নেতাকে দমিয়ে দেবার একটি নীলনকশা। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার সার্ভিস এসোসিয়েশনের সাথে সুর মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনার এমপি নিক্সনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। নির্বাচন কমিশনার একজন বিসিএস কর্মকর্তা ছিলেন। আমলাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সংহতি কতটা দৃঢ় এখান থেকে কিছুটা আন্দাজ করতে পারি আমরা। পরেরদিন চরভদ্রাসন থানায় নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের বিষয়ে অবগত হয়ে নিক্সন চৌধুরী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানান যে তিনি মামলা মোকাবেলা করবেন।

মামলা দায়ের হবার দিন আরেকটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম, নিক্সনের যে কর্মীকে আটক করাকে কেন্দ্র করে এত কাহিনীর জন্ম সেই কর্মী একজন সরকারি চাকরিজীবী। ভিন্ন জেলার একটি পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী। ছুটি না নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালন করার অপরাধে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের সরাসরি রাজনীতি করার অধিকার না থাকলেও ভোট দেবার অধিকার আছে। ভোট দিতে গিয়ে এজেন্টের দায়িত্ব পালন করা যায় কি যায় না সেই তর্কে না গিয়ে আমরা বরং এটা ভেবে অবাক হই যে, রাজনৈতিক নের্তৃত্বের সাথে প্রকাশ্য বিরোধে লিপ্ত হওয়া তো সরাসরি রাজনীতিরই শামিল। অথচ একই অপরাধে একজন নিম্নস্তরের কর্মচারীকে বরখাস্ত করা যায়, কিন্তু নগ্ন রাজনীতি করা আমলারা থাকছেন বহাল তবিয়তে! বিনানুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের ঘটনা দুর্নীতিগ্রস্ত এই দেশে হরহামেশা ঘটে। কিন্তু বিধির খাতা চাঙেই তোলা থাকে। ঘটনা আলোচিত হবার কারনে একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বলী হতে হয়েছে মাত্র। এই ঘটনা ইউএনও পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কথাগুলো নিক্সন চৌধুরী উল্লিখিত ইউএনওকে লক্ষ্য করে বলেন নাই এটা পরিষ্কার, বলা হয়েছে ভাঙ্গা উপজেলার এসিল্যান্ডকে লক্ষ্য করে। ঘটনার প্রবাহ দেখে অনুমান করছি, কথাগুলো চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজের গায়ে মেখেছেন। নিঃসন্দেহে এটি তার অপরিপক্কতার পরিচয়। তবে আমলারা নিজ অপরিপক্কতাকে স্বীকার করে না এমনটা আমরা বারবার লক্ষ্য করেছি।

আমরা অশ্রাব্য ভাষার সাফাই ও বৈধতা দিতে এই আলোচনা ফাঁদতে বসিনি। ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্কের ধরন অনুযায়ী আলাপচারিতার ভাষা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ ধারন করে। দুজন ব্যক্তির একান্ত আলাপে তৃতীয় ব্যক্তির কানপাতা যেমন অভব্যতা, দুজন ব্যক্তির ফোনালাপ প্রকাশ্যে এনে গণমানুষকে কানপাতার সুযোগ করে দেয়া আরো বেশি অভব্যতা। আমলারা রাজনীতিকদের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে গিয়ে সভ্যতা-ভব্যতার ধারও ধারছে না দেখা যাচ্ছে। নিক্সন চৌধুরী একজন লড়াকু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তারুণ্যের অমিত তেজ ও উদ্দীপনা নিয়ে রুপকথার নায়কের মত যার উত্থান। নিক্সন চৌধুরীর এই উত্থানের পেছনে রয়েছে ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও মর্যাদাহীনতা। নিক্সন চৌধুরী জনতার মূল্যায়ণ করে এবং তার কর্মীদের ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে সমগ্র নির্বাচনী আসনে জাদুকরের ন্যায় উত্থিত হয়েছেন। ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাংলাদেশে এই উত্থান আমাদের চোখে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। 

একজন জাত পলিটিসিয়ানের ভূমিকায় দীর্ঘ সাত বছর ধরে নিক্সন চৌধুরী তার নির্বাচনী এলাকার জনসাধারণকে রাজনৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তুলেছেন। তার বিরোধী শিবির সাময়িক এই বিভ্রাট দেখে মিষ্টি বিতরণ করে যে উল্লাস করছে তাতে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই প্রকট করে তুলছেন। মিষ্টি বিতরণের খবরটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। যেই জিনিসের অভাবে এত বড় একটি নির্বাচনী আসনে মাত্র তেইশ দিনের প্রচারণা চালিয়ে নিক্সন চৌধুরী 'এলাম দেখলাম জয় করলাম' এর মত এমপি নির্বাচিত হয়ে গেলেন, সেই জিনিসের অভাব তো পুরণ করতে পারবেন না তারা। তাহলে তাদের এই উল্লাসের পেছনে কোন প্রেরণা কাজ করছে? রাজনীতির নামে রাজনীতিরই বিরোধীতা নয় কি? ঠিক যেমন আমলারা করছে?

আমলাদের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্ক সব সময় সতর্কতার সাথে মোকাবেলা করতে হয়। কোনো দেশে যখন রাজনৈতিক নেতাদের যোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে তখন সেদেশের আমলারা রাজনীতিকদের পিঠে সওয়ার হয়ে ইচ্ছে মত ছড়ি ঘুরায়। এমপি নিক্সন চৌধুরীর উপর ছড়ি ঘুরাতে ব্যর্থ হয়ে সারাদেশের আমলারা জোটবদ্ধ হয়ে যে ঘৃণ্য তৎপরতার প্রকাশ ঘটালেন তাতে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত সুস্পষ্টভাবেই হুমকিতে পড়লো। আগামী দিনে জনমুখী রাজনীতি করতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতারা ভয় পাবেন। ফলে নিক্সন চৌধুরীর সামনে যে নতুন লড়াইয়ের অধ্যায় শুরু হলো সেখানে তার জিতে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক নের্তৃত্বের জন্যই এটি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। আপাতত লড়াইটি নিক্সন চৌধুরীকে একাই করতে হবে। অবশ্য একা বলা যাবে না তাকে। কারন তার সাথে রয়েছে ফরিদপুর-৪ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা। রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দখল আছে এমন মানুষদের সামনে নিক্সনের ভবিষ্যত লড়াইটি প্রচন্ড আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে। আগামীতে এখান থেকেই বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির ডিসকোর্সটি উঠে আসবে বলে আশা করা যায়।

-রুদ্রপীড় আহমেদ, রাজনীতি বিশ্লেষক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য