ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজা এবং রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্যে যখন দেশটির লাখ লাখ মানুষ শোকাহত, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
সোমবার (৬ জুলাই) মধ্যরাতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই হামলা চালায়। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আকস্মিক এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম সংস্থা (ইউকেএমটিও) মঙ্গলবার ভোরে জানিয়েছে, ওমানের লিমা থেকে প্রায় ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্বে দক্ষিণমুখী যাত্রার সময় একটি ট্যাংকারের বাম পাশে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে জাহাজটিতে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন ধরে যায়। তবে এতে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই ইরানের বিপ্লবী গার্ড সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে ওই অঞ্চলের জাহাজগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তারা বলেছিল, ‘নির্দেশনা অমান্য করলে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আপনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে প্রস্তুত।’
আক্রমণের শিকার হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে একটি হলো কাতার গ্যাসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নাকিলাতের মালিকানাধীন ও পরিচালিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) ট্যাংকার ‘আল রেকায়াত’। ক্ষেপণাস্ত্রটি জাহাজটির বাম পাশে ইঞ্জিন রুমের ওপরের অংশে সরাসরি আঘাত হানে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হামলার ফলে ইঞ্জিন রুমে আগুন লেগে যায় এবং চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে অবস্থানকালে জাহাজটি এই হামলার শিকার হয়। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদে জাহাজের ডান পাশে একত্রিত হতে পেরেছেন।
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতার জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকের আবহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরান বিশ্বকে নিজের রণপ্রস্তুতির বার্তা দিল। তেহরান স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, অভ্যন্তরীণ শোক বা বড় নেতৃত্ব হারানোর পরও তাদের সামরিক কমান্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেইন অব কন্ট্রোল বিন্দুমাত্র দুর্বল হয়নি। হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুটে এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের জন্য একটি সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক হুঁশিয়ারি। ইরান তার চিরশত্রুদের দেখাতে চাইল, চরম সংকটের মুহূর্তেও তারা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমুদ্রসীমায় যেকোনো সময় বড় ধরনের আঘাত হানতে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় তৈরি করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।






মন্তব্য