ভোট: একটি সাক্ষ্য, একটি আমানত, একটি জবাবদিহি

  •  মুফতি সাইফুল ইসলাম
  • বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০২:০২:০০
  • কপি লিঙ্ক

রাত পোহালেই জাতীয় নির্বাচন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি নাগরিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলেও একজন মুসলিমের দৃষ্টিতে ভোট কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি নৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গীকারও বটে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট হয়, ভোটের সঙ্গে ইসলামের কয়েকটি মৌলিক নীতি সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এটি একদিকে সাক্ষ্য, অন্যদিকে সুপারিশ; একই সঙ্গে এটি প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং একটি গুরুতর আমানত, যার জন্য আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে।

প্রথমত, ভোট একটি সাক্ষ্য। ইসলামে সাক্ষ্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, তা নিজেদের বিরুদ্ধে হোক বা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে।” (সুরা নিসা, আয়াত :১৩৫)

ভোট দেওয়ার সময় একজন ভোটার মূলত এই সাক্ষ্যই প্রদান করেন যে, তার বিবেচনায় এই ব্যক্তি নেতৃত্বের জন্য যোগ্য।

তাই পরিচয়, সম্পর্ক, দলীয় আবেগ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া মিথ্যা সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। একইভাবে যোগ্য ব্যক্তিকে জেনেও ভোট না দেওয়া বা উদাসীন থাকা সাক্ষ্য গোপনের শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে তা গোপন করে, তার অন্তর অবশ্যই পাপী।” (সুরা বাকারাহ, আয়াত:২৮৩)
দ্বিতীয়ত, ভোট একটি সুপারিশ।

কোরআন ঘোষণা করে, “যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজে সুপারিশ করবে, সে তার অংশ পাবে; আর যে মন্দ কাজে সুপারিশ করবে, সে তার বোঝা বহন করবে।” (সুরা নিসা, আয়াত : ৮৫)
একজন ভোটার যখন কাউকে ভোট দেন, তখন তিনি মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে এই সুপারিশই করেন যে, এই ব্যক্তিকে ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হোক। পরবর্তীতে যদি সেই ব্যক্তি দুর্নীতি, অন্যায় বা জুলুমে লিপ্ত হয়, তবে সেই ভুল সুপারিশের নৈতিক দায় থেকেও ভোটদাতা সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি জালিমকে তার জুলুমে সহযোগিতা করে, সে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হবে (মুসনাদে আহমাদ)।

তৃতীয়ত, ভোট হলো প্রতিনিধি বা উকিল নিয়োগ।

ইসলামী শরিয়তে ‘ওকালাহ’ একটি স্বীকৃত বিধান, যেখানে কাউকে নিজের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের পক্ষেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের ক্ষমতা ও অধিকার একজনের হাতে অর্পণ করে। এই কারণেই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবী করিম (সা.) বলেছেন,
“যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” (সহিহ বুখারি)
চতুর্থত, ভোট একটি আমানত। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন—তোমরা আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে অর্পণ করো।” (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)

ভোটাধিকার এমন একটি সামাজিক আমানত, যা ব্যক্তিগত লাভ, ভয়, প্রলোভন বা দলীয় অন্ধতার কারণে অপব্যবহার করা মারাত্মক খিয়ানত। অর্থের বিনিময়ে ভোট দেওয়া, প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করা বা জেনে-বুঝে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা আমানতদারিতার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার ঈমান নেই।” (মুসনাদে আহমাদ)

অনেকেই মনে করেন, ভোট না দিলে দায় এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে নীরবতাও সব সময় নিরপেক্ষতা নয়। যখন ভালো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে, তখন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া অনেক সময় মন্দকে শক্তিশালী করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা নেক কাজে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।” (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২)

সবশেষে, একজন মুসলিমের জন্য ভোট কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি নৈতিক পরীক্ষা। এখানে বিবেচ্য হওয়া উচিত প্রার্থীর সততা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার যোগ্যতা। দল, ব্যক্তিগত লাভ বা আবেগ নয়, বরং তাকওয়া ও জবাবদিহির চেতনা সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।

কারণ এই একটি ভোট শুধু একটি ব্যালটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সাক্ষ্য, একটি আমানত এবং এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার হিসাব একদিন মহান রবের দরবারেও দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী, দায়িত্বশীল ও আমানতদার বানান। আমিন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য