পানির দাম সর্বোচ্চ ৫০, সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ টাকা করার প্রস্তাব

  • অনলাইন
  • সোমবার, ১৮ জুলাই ২০২২ ০২:০৭:০০
  • কপি লিঙ্ক

পানির দাম সমন্বয়ের চিন্তা করছে ঢাকা ওয়াসা। এরই প্রেক্ষিতে ওয়াটার এইড এবং ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ঢাকা ওয়াসা) এলাকাভিত্তিক পানির মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক টেকনিক্যাল স্টাডির (কারিগরি গবেষণা) ফল উপস্থাপন করেছে। এতে এক হাজার লিটার পানির দাম সর্বোচ্চ ৫০ ও সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আজ রবিবার রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এলাকাভি‌ত্তিক পা‌নির দাম নির্ধারণ বিষয়ক (কা‌রিগ‌রি গবেষণা ফলাফল শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণার ফল অনুযায়ী প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা গেলে ওয়াসা স্বনির্ভর হবে বলে জানিয়েছে কর্তপক্ষ।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঢাকা ওয়াসার প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। আর বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৪২ টাকা। ওয়সার বর্তমানে এক হাজার লিটার পানি উৎপাদনে ব্যয় হয় ২৫ থেকে ২৬ টাকা। তবে রাজধানীকে ১০টি জোনে ভাগ করে এলাকাভিত্তিক ও গ্রাহকভিত্তিকভাবে পানির নতুন দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে ঢাকা ওয়াসা ও ওয়াটার এইডের যৌথ গবেষণা ফলে। প্রস্তাবিত দামের বিষয়ে গ্রাহক পর্যায়ে আরো আলোচনা করা হবে বলে জানান ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান।

ফলাফলের প্রস্তাবনায়, উচ্চবিত্তের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি হাজার লিটারে উচ্চবিত্তদের জন্য দাম বাড়ছে ২২ টাকা ৩২ টাকা। ওয়াসার তথ্যমতে নগরে ওয়াসার উচ্চবিত্ত গ্রাহক শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশ। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের পানির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ টাকা ২৫ পয়সা। উৎপাদন মূল্যে পানি পাবে রাজধানীর মধ্যবিত্ত মানুষ। দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ টাকা। যা আগের দামের চেয়ে ৯ টাকা ৮২ পয়সা বেশি। আর নগরে ওয়াসার মধ্যবিত্ত গ্রাহক ৪ শতাংশ।

নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য দাম বাড়ছে ৩ টাকা ৫৭ পয়সা। প্রস্তাবিত দাম ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা। আর রাজধানীতে ওয়াসার নিম্নমধ্যবিত্ত গ্রাহকই সর্বোচ্চ। যা শতকরা ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষ একই পরিমাণ পানির জন্য বিল দেবেন ১২ টাকা ৫০ পয়সা। ফলে তাদের প্রতি হাজার লিটারে পানির দাম কমছে দুই টাকা ৬৮ পয়সা।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ওয়াসার সাড়ে ১১ শতাংশ বাণিজ্যিক গ্রাহক বর্তমানে প্রতি হাজার লিটার পানির জন্য ৪২ টাকা পরিশোধ করছেন। প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সেই বিল বাড়বে আট টাকা। ৪২ টাকা দাঁড়াচ্ছে ৫০ টাকা। তবে উৎপাদন মূল্যের সমান। অর্থাৎ ২৫ টাকা হারে বিল পরিশোধ করবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। নতুন মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে ওয়াসার পানি উৎপাদন মূল্য ও বিক্রি মূল্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা সমান করা যাবে। অর্থাৎ এ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে না।

ফলাফল উপস্থাপন করেন ওয়াটার এইড বাংলাদেশের টেকনিক্যাল পরিচালক তাহমিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'ঢাকায় প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিবছর চার লাখ মানুষ যুক্ত হয়। ২৮ শতাংশ দরিদ্র ও ১২ খুবই দরিদ্র। জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। ঢাকা ওয়াসার ৪০১ কিলোমিটার পার স্কয়ার এলাকাতে সেবা দিয়ে থাকে। দুই ধরনের ট্যারিফে চলছে ওয়াসা। ডমেস্টিক ৮৮ শতাংশ ও ১২ শতাংশ বাণিজ্যিক।

গবেষণা ফলে মৌজা রেট, হোল্ডিং ট্যাক্স, ইনকাম ক্যাটাগরি এই তিন ভাগে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে ৯৫টি এরিয়াকে ১০টি জোন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী, ঢাকা ওয়াসা বোর্ড চেয়ারম্যান ড. প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা, ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‌'৬০ বছরেও পানির বিতরণ মূল্য উৎপাদন মূল্যের সমান হয়নি। এতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এমনকি গরিবদের টাকায় ধনীদের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এটি কেন করা হবে? সরকার যদি ভর্তুকি দেয় তাহলে না হয় হবে। তবে সেটি সবাইকে কেন দেবে? ভর্তুকির জন্য বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হয়। আমরা ৫০ বা ১০০ টাকা বেশি দিই তবে দেশ ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ থেকে বেঁচে যাবে। দেশকে ভালোবাসলে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সেখানে কিছু নিন্দা থাকতেই পারে। সেটি করতে গিয়ে কখনো বিপক্ষেও যেতে হবে। '

মন্ত্রী আরো বলেন, এখন সবাই ঢাকায় থাকতে চায়। সাধারণত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে থাকতে চায় না। এ জন্য প্রয়োজন ঢাকায় ব্যয় বাড়িয়ে জেলা ও উপজেলায় সেবার মান বাড়িয়ে দিতে হবে।

তাকসিম এ খান বলেন, ‌'আমরা এই আলোচনাটি অনেক আগে থেকেই শুরু করেছিলাম। পরবর্তীতে বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আমাদের বলেন কেন একই দামে সবাই পানি কিনবে? গুলশান আর যাত্রাবাড়ীর সাধারণ মানুষ তো এক রকম দাম দিলে যুক্তিযুক্ত হয় না। পরবর্তীতে আমরা এই রকম একটি স্টাডি করার দরকার মনে করেছি। আমরা যেকোনো পরিবর্তন এবং সিদ্ধান্ত গবেষণার মাধ্যমে করে থাকি। এই বিষয়ে আমরা আরো আলোচনা করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। '

তিনি বলেন, 'প্রতিদিন ওয়াসা ২১০ কোটি থেকে ২২০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে থাকে। সেখানে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়। অথচ এই পানি অন্তত ১০-২০ লাখ মানুষকে দিতে পারতাম। এসব বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। '

মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'সকল ক্ষেত্রে একই ধরনের পানি কেন? পান করা ও ধোয়া পরিষ্কারে ভিন্ন ধরনের পানি সরবরাহ করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার পানির উৎপাদন ব্যয় বিক্রয় মূল্যের চেয়েও বেশি। অথচ ওয়াসা অ্যাক্টে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি চলবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। আমরা পানির মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন অনুভব করলেও করোনাকালীন অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্তের কারণে বোর্ড তা বাড়াতে রাজি নয়।

হাসিন জাহান বলেন, 'যিনি বেশি আয় করেন তিনি বেশি টাকা দেবেন। মৌজার রেট, আয়ের রেট কী হবে তা বিবেচনায় আনা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় ২৫ টাকা হিসেবে ধরা হয়েছে। অতি দরিদ্র ও ধনী লোক কত টাকা দেবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। '

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা না হলে এই ট্যারিফ কাজ করবে না। সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেন বলেন, সাড়ে চার লাখ গাড়ি প্রতিদিন ধোয়া হয়। এখানে কিছু পানি বাঁচানো হলে ট্যারিফ বাড়াতে হবে না। পানির অপচয় রোধে গবেষণা করা দরকার। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিষয়ে যে আইন হয়েছে সেটি নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য