ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতি নদী তীরবর্তী মানুষ ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত পার করছেন। চোখের পলকেই নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে মাথাগোঁজার একমাত্র ঠিকানা। কেউ কেউ বাপ-দাদার ভিটে সরিয়ে অন্য জায়গা চলে যাচ্ছেন।
মধুমতি নদীতে সম্প্রতি তীব্র ভাঙ্গন দেখা গিয়েছে। বিগত এক মাসে বিলীন হয়েছে দেড় শতাধিক বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং শত শত একর ফসলী জমি। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অর্ধ শতাধিক ঘরবাড়ি।
নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, এতিমখানা, মসজিদসহ বসতঘর ও ফসলী জমি। ভাঙ্গন আতংকে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে নদীর পূর্ব পাড়ের অনেকেই। তবে ভাঙন রোধে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এলাকাবাসী।
খবর পেয়ে বুধবার (৩০ জুলাই) দুপুরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল।এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রায়হানুর রহমান, ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (মধুখালী-বোয়ালমারী অঞ্চল) সন্তোষ কর্মকার, উপজেলা প্রকৌশলী মো. রাহাত ইসলামসহ জনপ্রতিনিধি, মিডিয়াকর্মী স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সরেজমিনে ভাঙন কবলিত এলাকা ঘুরে জানা যায়, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের টিটা পানাইল, শিকারপুর, ইকরাইল, টিটা, কোমরতিয়া গ্রামে ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। বিগত এক মাস যাবত মধুমতি নদীর পূর্ব পাড়ে ভাঙনে প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, রাস্তাঘাট ও একরের পর একর ফসলী জমি। ইতিমধ্যেই এ ইউনিয়নের দেড় শতাধিক বসতবাড়ি এবং শতশত একর ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যের জায়গায় মানবেতর বসবাস করছেন সব হারানো মানুষগুলো। আবার অনেকেই নদী পাড়ে এবং রাস্তার ধারে তাবু টানিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। যে সকল বসতবাড়ি ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে ভাঙ্গন আতংকে নির্ঘুম রাত কাটছে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের।
শিকারপুর গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম (৫০)বলেন, গত কয়েকদিনে এ গ্রামে ঘরবাড়িসহ প্রায় শতশত একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমার নিজের ২০ একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে আমি অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকারের কাছে স্থায়ী বাধের দাবি জানান এ কৃষক।
শিকারপুর গ্রামের আরেক কৃষক জালাল মোল্লা( ৮২)জানান, আলফাডাঙ্গা উপজেলার মধুমতি নদীর পূর্ব পাড়ের মানুষ আমরা। এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভিটেমাটি হারা লোকজন অনেকেই রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। মাদ্রাসা, মসজিদ, প্রাইমারী স্কুল, এতিমখানাসহ অনেক বাড়িঘর,ফসলিজমি ইতিমধ্যে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমার নিজেরও ৩০থেকে ৪০ একর জমি নদীর গর্ভে চলে গিয়াছে।
মধুমতি নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ শিকারপুর গ্রামের বিধবা মলিনা রানী বিশ্বাস (৬০) বলেন, পর পর আমার বাড়ি ৪ বার ভেঙ্গে গেছে। ঘরবাড়িসহ গাছপালা নদীতে চলে গেছে। বাড়িঘর নাই রাস্তার পাশে বস্তির মত পড়ে আছি। বলতে বলতে ক্লান্ত আর বলার জায়গা নাই। নদীর ওপারে বাড়ি হওয়ায় আমাদের মত বাসিন্দাদের কেউ খোজ রাখে না। আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে কষ্টের কথা জানালাম।
ইকরাইল গ্রামের কৃষক মোশারফ মোল্লা (৫৬) জানান, আমরা আলফাডাঙ্গা উপজেলার মধুমতি নদীর পূর্ব পাড়ের মানুষ ভাঙনের কবলে পড়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করছি। অনেকবার বাড়ি সরানো লাগছে। নদীর ভাঙন শুরু হলে মানুষ আসতে আসতে নদীর মধ্যে ঘরবাড়িসহ জায়গা জমি চলে যায়। ভাঙতে ভাঙতে আমার আর কিছু নাই। রাস্তার পাশে কোনরকম ছেলে—মেয়ে নিয়ে থাকতেছি।
ইকরাইল গ্রামের গৃহবধু হুসি বেগম জানান, বিয়ে হওয়ার ১০ বছরের মাথায় এ পর্যন্ত ৫ বার বাড়িঘর নদীতে ভেঙ্গে গেছে। বাড়ি ভাঙতে ভাঙতে আর নিজেদের কিছুই নাই। ঘরবাড়ি ভাঙে আবার নতুন উঠানোর কিছুদিনের মাথায় ভাঙন শুরু হলে আবার নদীতে ঘরবাড়ি চলে যায়। সরকার আমাদের গ্রামে স্থায়ী বাঁধ করে দিলে পরিবার নিয়ে আমার মত অসহায় মানুষগুলো হয়তো বেঁচে যেত।
ওই ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য (৫ নম্বর ওয়ার্ড)মো. মুরাদ হোসেন বলেন, বর্ষার শুরু হতেই তাঁর ইউনিয়নে ভাঙন শুরু হয়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না করলে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে আরো বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলী জমিসহ নানা প্রতিষ্ঠান।সরকারের কাছে স্থায়ী বাধের দাবি জানান তিনি।
ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হাসান শিপন জানান, মধুমতী নদীর ভাঙ্গনে অসংখ্য বসতবাড়ি, আবাদি জমি, স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ নদীতে বিলিন হয়েছে। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে এখানে যে ভোটার ছিল। এখন আর তা নেই। ভাঙ্গনের রোধে সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোন ধরনের পদক্ষেপ না নেয়া হয়, কয়েক বছরের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে পুরো গ্রাম-জনপদ। তিনি ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (মধুখালী-বোয়ালমারী অঞ্চল) সন্তোষ কর্মকার জানান, ফসলি জমি বিলীনের ব্যাপারে ঘটনা স্থান পরিদর্শন করেছি। তিনি আরো বলেন, আগামীকাল ৩১ জুলাই বৃহস্পতিবার ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ নদী ভাঙ্গন ভাঙ্গন এলাকায় আসার কথা। পরবর্তীতে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, নদীভাঙন রোধে উপযুক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে জরুরি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।






মন্তব্য