ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে ভারত নানা কারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আমাদের অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান ও নিবিড় সম্পর্কযুক্ত সভ্যতাভিত্তিক ঐতিহ্য উভয় দেশের মূল্যবোধেরও মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। এমনকি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বন্ধন ছিন্ন হলেও পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যগত বন্ধন অটুট ছিল।
সর্বোপরি, যাঁর প্রবাদপ্রতিম, ক্যারিশমাটিক ও দুঃসাহসী নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও আস্থার সম্পর্কটি সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার হিসেবে আজও বিদ্যমান আছে। ভারত সরকার সব সময়ই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেছে এবং সে কারণেই স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে ভারত তার সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। ১৯৭১ সালে আমাদের দুই জাতির সমন্বিত সহযোগিতা ভোলার নয়।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আবার জাতির সামনে তুলে ধরা এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অবদান রাখা ভারতীয় সেনাদের ও অন্য ব্যক্তিদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের জন্য ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানায়।
গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র—বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে গৃহীত এই চার নীতি বঙ্গবন্ধুর মহান অবদান। এই নীতি ও আদর্শ সমুন্নত রাখার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর প্রতিশ্রুতিশীল অবস্থানে রয়েছেন। এর মাধ্যমেই তিনি তাঁর পিতার আদর্শ বাঁচিয়ে রাখছেন এবং তা বেগবান করছেন।
আমাদের সংবিধান অনুযায়ী ভারতও গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শ ধারণ করে। এই অভিন্ন মূল্যবোধের বিষয়টিও এই দুই দেশের সম্পর্ককে জোরালো করেছে। আজ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিস্তৃতি ও গভীরতার দিক থেকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রগাঢ় এবং অভূতপূর্ব মাত্রায় সফল। এক অনির্বচনীয় হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন ঘটিয়ে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করছেন। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে স্থাপিত সংযোগ প্রকল্প এবং বিমসটেকের (বঙ্গোপসাগরীয় বহুক্ষেত্রীয় প্রযুক্তিগত ও আর্থনীতিক সহযোগিতা উদ্যোগ) মাধ্যমে তাঁরা আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন নতুন মাত্রা যোগ করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দুই দেশের সীমানা জটিলতাগুলোর সুরাহা হচ্ছে। ২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী স্থলসীমানা বাস্তবায়িত হয়েছে। ওই একই বছর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় নৌ সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। ভারতের দেওয়া আর্থিক অনুদান ও ঋণ বাংলাদেশের উন্নয়নে অভূতপূর্ব ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ভারত বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান বাবদ মোট ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার দিয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশকে ভারতের দেওয়া ঋণের চেয়ে বেশি। এই ঋণসহায়তার আওতাধীন প্রকল্পগুলো আমলে নিয়ে তা দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ খাতে দুই দেশের সহযোগিতার কার্যক্রম বিশেষভাবে সফল হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। জ্বালানি খাতেও ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত আছে। ভারত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে বর্তমানে সড়কপথে ডিজেল সরবরাহ করছে। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহের জন্য শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ভারত পাইপলাইন নির্মাণ করছে।
২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার। তামাক, অ্যালকোহলসহ ২৫টি পণ্য বাদে সব পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে শতভাগ রপ্তানি শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে বাংলাদেশি বিভিন্ন কোম্পানি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। এসব পরিকাঠামোর কাজ শেষ হলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রুত বেড়ে যাবে। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যঘাটতি আরও কমিয়ে আনবে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ভারত থেকে বাংলাদেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করা হয়, তার অনেকগুলোই উৎপাদনমুখী শিল্পের মধ্যবর্তী পর্যায়ের পণ্য (যেমন তুলা, সুতা ও কাপড় এবং বস্ত্র উৎপাদনের সরঞ্জাম) বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপুল সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।




.jpg)

মন্তব্য