সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রকৃতির পরম আদরে গড়া সদরপুর। প্রকৃতি ঐতিহ্য আর উৎপাদনে সমৃদ্ধ এক জনপদ পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, ভূবনেশ্বর ও রামনগর নদী বিধৌত সদরপুর উপজেলা। সর্ষের হলদে সোভা আর মৌমাছির গুঞ্জনে প্রকৃতি এখানে রূপসী। অনন্যা এ ভূমির আছে , ধান, পাট, গম, বাদাম, নরিকেল, সুপারি, সফেদা ও খেজুর গাছের অসংখ্য সারি। অনেক কৃষিপণ্যের আকর ভূমি এটি।
রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এ উপজেলার উৎপাদিত সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখানে পাওয়া যায় স্বতন্ত্র সাধের খেজুরের গুড়, পাটালি গুড় ও সরিষার মধু। এ এলাকার পদ্মার রুপালী ইলিশ জগত বিখ্যাত। সবমিলিয়ে আপন ঐশ্বর্যে সত্যিকারভাবে গর্বিত এক জনপদ সদরপুর। ফরিদপুর জেলার ৯ টি উপজেলার মধ্যে সদরপুর ১ টি। ফরিদপুর জেলা শহর থেকে এই উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। উপনিবেশিক আমল থেকেই সদরপুর উপজেলা বেশ সমৃদ্ধ। ১৮৬৩ সালে সদরপুরে থানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে সদরপুর থানা থেকে উপজেলায় উন্নীত হয়।
এ উপজেলায় বসবাসরত মানুষ সর্বদা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর সর্বনাশা পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙ্গনের স্বীকার। সদরপুর উপজেলার নামকরণ তেমন কোন নির্ভরযাগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। তবে লোকমুখে শোনা যায় স্থানীয় বাইশরশি জমিদারদের যাতায়াতের জন্য বর্তমান উপজেলার উত্তর পাশে অবস্থিত ভূবনেশ্বর নদীর তীরে বড় বড় পানসি নৌকা নোঙ্গর করে রাখত। তাই যখনই নদীর তীরে আসাহত তখনই সদর কথাটি ব্যবহার করা হতো। আবার এও শোনা যায় যে, বর্তমান সদরপুর থানা যেখানে অবস্থিত সে জমির মালিকের নাম ছিল সদর আলী। সদর আলীর নাম থেকেই নাকি সদরপুরের উৎপত্তি।
সদরপুরের বিভিন্ন গ্রামের নামের শেষে রশি শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। মোগল আমলে রশির মাপে (১০০ হাত) জায়গা জমির পত্তন দেয়া হত বলে রশি শব্দযোগে এলাকার নাম হয়েছে। এর থেকে মোগল যুগে এই এলাকার গুরত্বপূর্ণ অবস্থানের একটা ধারণা পাওয়া যায়। আনন্দ নাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থে সদরপুরের যে উল্লেখ পাওয়া যায় সেখানে সদরপুরের কিছু এলাকা ফরিদপুর স্টেশন (গোপালপুর, কৃষ্ণপুর প্রভৃতি এলাকা), কিছু এলাকা থানা নগরকান্দা (নয়াগ্রাম,যাত্রাবাড়ী, ঠেঙ্গামারী প্রভৃতি), কিছু এলাকা ভাঙ্গা থানা (সাড়ে সাতরশি, চরব্রাহ্মন্দী, দশহাজার, শ্যামপুর, সদরপুর প্রভৃতি) এর অধীন ছিল। পরবর্তীকালে এই এলাকাগুলো একত্রিত করে সদরপুর সার্কেলের যাত্রা শুরু হয়।
পাকিস্থান আমলে সদরপুরে উন্নয়ন সার্কেলের অফিস ছিল বাইশ রশি জমিদার বাড়ীতে। ১৯৭৬ সালের ১৬ মার্চ অফিস বাইশ রশি জমিদার বাড়ী হতে থানা প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টি.টি. এন ডি.সি) তে স্থানান্তর করা হয়। সেসময় সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন আনন্দ চন্দ্র রায়। ৭ নভেম্বর ১৯৮২ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লে: জে: হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক সদরপুরকে আপগ্রেড থানা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সদরপুর উপজেলার উত্তরে ফরিদপুর সদর উপজেলা এবং চরভদ্রাসন উপজেলা। দক্ষিনে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলা এবং দক্ষিণ-পূর্বে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা। পূর্বে ঢাকা জেলার দোহার উপজেলা এবং পশ্চিমে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা। এই উপজেলা সাধারণত পলি, দো-আঁশ, এঁটেল ও বেলে মাটি দিয়ে গঠিত। এ অঞ্চলের মাটিতে কৃষিজাত ফসল দ্রত বর্ধনশীল। সদরপুরের আদ্রতার পরিমাণ ৭৭% থেকে ৮৮%।
বাংলাদেশে সদরপুর উপজেলার অবস্থান স্থানাঙ্কঃ ২°২৮′৩৩″ উত্তর ৯০°২′৫″ পূর্ব / ২৩.৪৭৫৮৩° উত্তর ৯০.০৩৪৭২° পূর্ব। সদরপুর উপজেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য মতে উপজেলাটির আয়তন ২৬১.২৯ বর্গ কিলোমিটার। জমির পরিমাণ ৬৪,৫৩৮.৬৩ একর। মোট আবাদি জমি ৪৩,৫৬০ একর, মোট খাদ্য উৎপাদন ৩৭,৪৪১ মেঃ টন, মোট খাদ্যের চাহিদা ৩২,৬৬৭ মেঃ টন। মোট জনসংখ্যা ১,৮৬,২৫৪ জন। পুরুষ ৮৯,৬৬৪ জন এবং মহিলা ৯৬,৫৯০ জন। লোক সংখ্যার ঘনত্ব ৬৫০ জন (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে)। মোট ভোটার ১,৪৪,৭৮০ জন। ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা, মুসলমান ১,৭৬,৭৩৬ জন, হিন্দু ১০,৫১৮ জন৷ ইউনিয়ন মোট ৯ টি, ওয়ার্ড ৩২৮ টি। এর মধ্যে ৩ টি ইউনিয়ন প্রত্যন্ত চরাঞ্চল।
এ উপজেলায় সরকারি কলেজে ১ টি, বেসরকারি কলেজ ১ টি, বেসরকারি মহিলা কলেজ ১ টি, সরকারি মাধ্যমিক বয়েস স্কুল ১ টি, সরকারি মাধ্যমিক গার্লস স্কুল ১ টি, বেসরকারী মাধ্যমিক স্কুল ২৩ টি, প্রাথমিক স্কুল ১২৯ টি, কিন্ডার গার্ডেন স্কুল ২০ টি, মাদ্রাসা ৫ টি, কাওমি মাদ্রাসা ৩৩ টি, টকনিক্যাল ও ভোকেশনাল স্কুল ২ টি। এই উপজেলায় শিক্ষার হার ৬০%। ধর্মীয় উপাসনালয়ের মধ্যে মসজিদ ৫৬২ টি এবং মন্দির ৩৮ টি। স্বাস্থ্য সেবায় সরকারি হাসপাতাল ১ টি, বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক ৪ টি, উপস্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র ৪ টি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র ৪ টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ১১ টি। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সোনালী ব্যাংক ৩ টি, কৃষি ব্যাংক ৩ টি, অগ্রণী ব্যাংক ১ টি, গ্রামীণ ব্যাংক ২ টি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১ টি, পূবালী ব্যাংক ১ টি, ব্রাক ব্যাংক ১ টি সহ বেশ কিছু এজেন্ট ব্যাংক রয়েছে। বিদ্যুতায়িত গ্রামের সংখ্যা ১৮৯ টি, সরবরাহকৃত আর্সেনিক মুক্ত টিউবওয়েল ৭২৫ টি, ডাকবাংলো রেস্টহাউজ ২ টি, প্রেসক্লাব ২ টি, স্টেডিয়াম মাঠ ১ টি, সিনেমা হল ১ টি, স্পিনিং মিলস্ ১ টি, রাইস মিলস্ ৪ টি, খাদ্র গুদাম ১ টি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ আশ্রয়ন প্রকল্প ২ টি, গুচ্ছ গ্রাম ২ টি। এই উপজেলার সম্ভাবনার ক্ষেত্র ২ টি, এর মৌসুমী ফসল এবং এর দর্শনীয় স্থানসমূহ। আটরশিতে পীর হযরত মওলানা মুহাম্মদ হাসমত উল্লাহ নকশ বন্দী মুজাদ্দেদী (কুঃ ছেঃ আঃ) সাহেবের দরবার শরীফ তথা বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ও থানা সদর হতে ৪ মাইল পূর্বে ঢেউখালী ইউনিয়নে হযরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ পীর সাহেবের চন্দ্রপাড়া পাক দরবার শরীফ অবস্থিত। উক্ত দুটি স্থানে প্রতিদিন অসংখ্য মুরিদান ও দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এছাড়াও সদরপুর উপজেলা সদর হতে ৪ কিঃ মিঃ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ২২ রশি জমিদার বাড়ী দর্শনীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। জমিদার বাড়ীটি সংস্কার করা গেলে এটিকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা যেত। আড়িয়াল খাঁ নদের উৎপত্তিস্থলে পদ্মা নদীর দৃশ্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ উপজেলার আকোটের চর ইউনিয়নের মনিকোঠা বাজারে একটি আকর্ষণীয় সাত মাথা বিশিষ্ট খেজুর গাছ রয়েছে, ১৪ রশি বাজারে শতবর্ষী পুরান একটি রেন্ডি গাছ রয়েছে, এছারাও ১৭ রশি গ্রামে একটি গায়েবী মসজিদ রয়েছে।
অত্র উপজেলায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস, ১লা বৈশাখ, বিভিন্ন সঙ্গীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, যাত্রাপালা, নাটক, লোকনাট্য, গীতিনাট্য, গাজীর গান, পালা গান, বিচার গান ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। সদরপুর উপজেলা অনেক জ্ঞানী, গুণী ও বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মস্থান। প্রখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- বিচারপতি মরহুম মোঃ ইব্রাহিম, এম এন এ (প্রাক্তন) মরহুম আদিল উদ্দিন হাওলাদার, জাতীয় সংসদ সদস্য (প্রাক্তন) মরহুম অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য (প্রাক্তন) মরহুম সালেহা মোশাররফ। জাতীয় সংসদ সদস্য (প্রাক্তন) মরহুম আব্দুস সালাম মিয়া, জাতীয় সংসদ সদস্য (প্রাক্তন) জনাব আজাহারুল হক মোল্লা সহ আরো অনেকে৷ ১৯৭১ সালে মুক্তি যুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল এ উপজেলার ২৬৩ জন মুক্তি যোদ্ধা। তারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা দিয়ে ঝাপিয়ে পরেছিল যুদ্ধে। এর মধ্যে শহীদ হয়েছিলেন ২ জন।
সড়ক পথে ঢাকা থেকে এ উপজেলায় আসতে ঢাকা-আরিচা জাতীয় মহাসড়ক পথে পাটুরিয়া ফেরিঘাট থেকে দৌলদিয়া হয়ে ফরিদপুর জেলা সদর। সেখান থেকে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের পুখুরিয়া থেকে ১২ কিলোমিটার পার হলেই সদরপুর উপজেলা পরিষদ। এছাড়া ঢাকা -মাওয়া মহাসড়কে শ্রীনগর হয়ে সড়ক পথে মোকসেদপুর ঘাট থেকে ট্রলার/ স্পীডবোটে মাদ্রাসা ঘাটে নেমে সড়ক পথে সদরপুর পৌঁছা যায়। এই পথে সময় কম লাগে। তাছাড়া নদী পথে ঢাকার শোয়ারী ঘাট থেকে ট্রলারে করে সদরপুর পৌঁছা যায়। সাধারণত পন্য পরিবহনের জন্য এই রূট ব্যবহার করা হয়। সদরপুর উপজেলার অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর অনেক পর্যটক ছুটে আসেন এই উপজেলায় আর সদরপুর তাদের বরণ করে নেয় অপার মহিমায়।
শীঘ্রই সদরপুর উপজেলার পাশে ভাঙ্গা থানার নূরুল্লাগঞ্জ ইউনিয়নে স্থাপিত হতে যাচ্ছে পৃথিবীর অনন্য ভৌগলিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বঙ্গবন্ধু মানমন্দি ও পর্যটন কেন্দ্র। সদরপুরের গ্রামগুলো নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ঢাকা থাকলেও বাংলাদেশে গ্রাম পর্যটনের কোনো কার্যকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এখনো। যার ফলে দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যাচ্ছে গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর জীবন বৈচিত্র। নগরায়নের প্রভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য। হারিয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্য। তারপরেও সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে টিকে থাকা গ্রামীণ সৌন্দর্যকে আমরা চাইলেই উপভোগ করতে পারি। নিশ্চিন্তে হারিয়ে যেতে পারি প্রকৃতির কোলে। গ্রামগুলো বেঁচে থাকুক তার আপন মহিমায়। অতুলনীয় সৌন্দর্য, বৈচিত্র আর ঐতিহ্যগুলোও টিকে থাকুক প্রজন্মের অহংকার হয়ে।
বাংলাদেশ জমিন/ সংবাদটি শেয়ার করুন






মন্তব্য