সাতক্ষীরায় ২ কোটি টাকার মাছ ৩৪ লাখ টাকায় বিক্রি

  • সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
  • শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০১৯ ১২:০০:০০
  • কপি লিঙ্ক

মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে আমদানিকৃত চার ট্রাক বিভিন্ন উন্নত প্রজাতির মিঠা পানির মাছ আটক করে বিজিবি। মাছের মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। এসব মাছ গভীর রাতে জেলার এক শীর্ষ চোরাকারবারীকে নামমাত্র মূল্যে নিলামে ক্রয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিজিবি ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজসে মাত্র ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নিলাম দেওয়ায় সরকার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে যশোর ও খুলনার ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা এই নিলামে অংশ নিতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ওই শীর্ষ চোরাকারবারীর লোকজন।

ফলে অর্ধেকেরও কম টাকায় নিলাম পেয়ে যায় আশিক এন্টার প্রাইজের মালিক আল-ফেরদৌস ওরফে আলফা। এ ঘটনায় জেলায় রিতিমত হৈ চৈ পড়েযায়।

সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরার ভোমরার ইউপি চেয়ারম্যান ইছরাফিল গাজী ২৪ আগষ্ট মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এলসির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভোমরা ইছামতি ফুডস্ দুটি বিল অফ এন্টিতে ৮ ট্রাক ও ১০ ট্রাক মোট ১৮ ট্রাক উন্নত প্রজাতির মিঠা পানির মাছ আমদানি করে। মেসার্স সুন্দরবন ট্রেডিং এজেন্সি এই মাছ ভোমরা কাস্টমস থেকে ছাড় করান।

প্রায় ৪০ লাখ টাকার মত শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এই মাছ ভোমরা বন্দর থেকে ৩০টি ট্রাক যোগে টাকায় পাঠানোর সময় এর মধ্যে ৪ ট্রাক মাছ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিজিবি আটক করে।

বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে শহরের বিজিবি ক্যাম্পের সামনে থেকে ৩টি কার্গো ট্রাকসহ ৪ ট্রাক ভর্তি দেশীয় মিঠা পানির মাছ আটক করা হয়। যার মধ্যে আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের বোয়াল, ফলুই, ট্যাংরা, ভেটকি, বাইন, গোলসা, রিটা মাছ অন্যতম। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এরপর থেকে মিশনে নামেন পুলিশের তালিকাভূক্ত জেলার এক শীর্ষ চোরাকারবারী। তিনি বিজিবি থেকে শুরু করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সাথে শুরু করেন বিভিন্ন দেন দরবার।

এক পর্যায়ে বিজিবি ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজসে চুপিসারে রাত ১২ টার দিকে শহরের কাস্টমস গোডাউনে বিজিবি ক্যাম্প থেকে আটককৃত ৪ ট্রাক মাছের মধ্যে ঢাকা মেট্র-ট ১৩-২৫৬৮ নাম্বারের মা আমেনা নামের কার্গো ট্রাক ভর্তি মাছ নিলামের জন্য নিয়ে আসা হয়। লোক জানাজানির ভয়ে কৌশল করে বাকি ৩ ট্রাক মাছ ৩৩ ব্যাটালিয়ন বিজিবির সদর ক্যাম্পেই রাখা হয়। কাস্টমস গোডাউনে মাছের ট্রাক আসতেই মূহুর্তের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হন জেলার শীর্ষ ওই চোরাকারবারীসহ তার লোকজন।

রাতভর পুরো কাস্টমস গোডাউন সরগম হয়ে উঠে। রাতের অধারে শুরু হয় নিলাম সিন্ডিকেট। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াই
তড়িঘড়ি করে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করেন কাস্টমস গোডাউন অফিসার আজিজ রেজা ও সরকারী নিলামকারী মো. জাহিদুল ইসলাম।

নিলামে অংশ নেয় আশিক এন্টারপ্রাইজ, মুকুল স্টোর, অজয় ট্রেডার্স, মিন্টু এন্টার প্রাইজ, জাহিদ এন্টারপ্রাইজ, সাহেবা এন্টারপ্রাইজ, সৈয়দ সাকলাইন এন্টারপ্রাইজ, সৌরভ এন্টারপ্রাইজসহ মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান।

এরা সবাই আশিক এন্টারপ্রাইজের নিজস্ব লোকজন। সিন্ডিকেটের কারণে অনেকে নিলাম প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। এ সময় আলফার নেতৃত্বে সরকারী দলের ক্যাডার উজ্জল, জাকিরসহ ৪/৫ জন সন্ত্রাসী মহড়া দিয়ে যশোর ও খুলনা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের
ভয়ভীতি দেখিয়ে নিলামে অংশ নিতে দেয়নি।

এ সময় সেখানে উপস্থিত কাটিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ তছলিম নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। ফলে ২ কোটি টাকা মূল্যের ওই মাছ মাত্র ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিলাম ক্রয় করেন আশিক এন্টারপ্রাইজের আল ফেরদৌস আলফা।

এর পরপরি সিন্ডিকেটের হোতা আলফার লোকজন নিলামকৃত ওই মাছ পুনরায় তাদের ভিতরে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাম ধরে সিন্ডিকেটের নিকট থেকে আল ফেরদৌস আলফা হাতিয়ে নেয়। পরে গোডাউন কাস্টমস কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের সদস্য, যুবলীগ,
ছাত্রলীগ ও পুলিশ মিলে বাড়তি ৯ লক্ষ টাকা ভাগবাটোয়া করে নেয়।

এদিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াই গোডাউন অফিসার আজিজ রেজা, সরকারী নিলামকারী মো. জাহিদুল ইসলাম এই নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করেন। রাতভর চলে নিলাম কার্যক্রম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিজিবির সিজার এনসিও হাবিলদার বাশার।

তিনি জানান, বেলা সাড়ে ১২টার সময় মিলবাজার এলাকা থেকে ৪ ট্রাক মাছ আটক করা হয়। সিজারকৃত মাছের বাজার মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ ৮ হাজার টাকা। দিনের বেলায় আটককৃত মাছ কেন গভীরে রাতে নিলামের জন্য গোডাউনে জমা দেওয়া হলো সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেনি।

এদিকে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের এসব মাছ মাত্র ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নিলাম দেখানো হয়। রাতের আধারে গোপন করে ম্যাজিষ্ট্রেট ছাড়াই কেন এই নিলাম কার্যক্রম জানতে চাইলে এ এব্যাপারে গোডাউন অফিসার আজিজ রেজা, সরকারী
নিলামকারী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, গভীর রাত বলে তাই আর ম্যাজিস্ট্রেট ডাকা হয়নি। ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় আশিক এন্টারপ্রাইজ উক্ত নিলাম ক্রয় করেছেন।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি’র অধিনায়ক লে: কর্ণেল গোলাম মহিউদ্দিন খন্দকার জানান, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে মিঠা পানির হিমায়িত মাছ আমদানিকরা হয়। এসব মাছ ভোমরা বন্দর থেকে ট্রাক যোগে ঢাকায় পাঠানোর সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শহরের বিজিবি হেডকোয়াটারের সামনে থেকে আটক করা হয়।

তবে ভোমরা বন্দর কাস্টমস দিয়ে আমদানি করা এসব মাছের মালিকানা কেউ দাবি করেনি। পরে আটককৃত ৪ ট্রাক মাছ
কাস্টমস হস্তান্তর করা হয়।

মন্তব্য