নারীবাদের ইতিহাস এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীবাদ


শেখ আবদুল্লাহ মাশুক নারীবাদের সাথে যারা বিয়েহীন,সন্তানহীন, ছোট চুল,ছোট পোষাক,কপালে বড় টিপ,পুরুষবিদ্বেষী নারী এসব গুলিয়ে ফেলেন তারা নিশ্চয়ই নারীবাদের ইতিহাস এবং আদর্শিক সংগ্রামের পরিচিত নন।নারীবাদ সম্পর্কে এসব প্রেজুডিস দূর করতে হলে আপনাকে নারীবাদের দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। কেন সমাজে এই মতাদর্শ এলো এর প্রয়োজনীয়তা কি এবং কেন।এমন সব প্রশ্নের উত্তর জানতে লেখাটি সাহায্য করতে পারে আপনাকে।

নারীবাদের সাথে যারা বিয়েহীন,সন্তানহীন, ছোট চুল,ছোট পোষাক,কপালে বড় টিপ,পুরুষবিদ্বেষী নারী এসব গুলিয়ে ফেলেন তারা নিশ্চয়ই নারীবাদের ইতিহাস এবং আদর্শিক সংগ্রামের পরিচিত নন।নারীবাদ সম্পর্কে এসব প্রেজুডিস দূর করতে হলে আপনাকে নারীবাদের দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। কেন সমাজে এই মতাদর্শ এলো এর প্রয়োজনীয়তা কি এবং কেন।এমন সব প্রশ্নের উত্তর জানতে লেখাটি সাহায্য করতে পারে আপনাকে।

নারীবাদ কি?এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এটা এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন যেটা পুরুষতন্ত্রের প্রভাব থেকে নারীকে রক্ষা এবং নারী-পুরুষের সমতায় কাজ করে। ফরাসি দার্শনিক ও ইউটোপীয় সমাজবাদী চার্লস ফুরিয়ে ১৮৩৭ সালে প্রথম নারীবাদ শব্দের ব্যবহার করেন।আরেক ফরাসি বুদ্ধিজীবি সিমন দ্য বুভোয়ার মতে নারী অধিকারের পক্ষে প্রথম কলম ধরেছিলেন ক্রিস্টিয়ান ডি পুজান।তবে ডাচ নারী মার্গারেট লুকাসের Female orations কে প্রথম নারীবাদী সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। শুরুর দিকে এই আন্দোলন ভোটাধিকার,চুক্তিতে সমঅধিকার,বিবাহ এবং সন্তান দেখাশোনার স্বাধীনতা, সম্পত্তির সমানাধিকার নিয়ে সোচ্চার হলেও বর্তমানে নারীবাদ নিজ দেহের উপর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন,ডমেস্টিক ভায়োলেন্স থেকে নারী ও শিশুকে সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সচেষ্ট। নারীবাদ আন্দোলনকে পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক সমাজের ফসল মনে করা হয়।১৮৮০ সালের দিকে ফ্রান্সে ১৮৯০ এর প্রাক্কালে যুক্তরাজ্যে এবং ১৯১০ এ যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তার লাভ করতে থাকে। এর ভিত্তিতে একে তিন ধাপে ভাগ করা যায়।প্রত্যেক ধাপেই এই আন্দোলনের নিজস্ব দাবি ছিলো এবং সেগুলো সফলভাবে আদায় করে নিতে সক্ষম হয় রাষ্ট্র থেকে।যেটাকে নারীবাদের সফলতা হিসেবে দেখা যেতে পার। এখানে ধাপগুলোকে আমরা তরঙ্গ বা ঢেউ হিসেবে চিহ্নিত করবো প্রথম তরঙ্গ : আজ থেকে ১৫০ বছর পূর্বে বিশ্বের কোথাও নারীর ভোটাধিকার ছিলো না।এর প্রেক্ষিতে নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা হয় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যেটাকে এই আন্দোলনের প্রথম ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।যার ফলাফল স্বরূপ ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ডে, ১৯০২ সালে অষ্ট্রেলিয়ায়, ১৯১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে,১৯২১ সালে যুক্তরাজ্যে নারীর ভোটাধিকার অর্জিত হয়।এজন্য বলা হয় প্রথম তরঙ্গ ছিলো রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পর্যায়ে এপর্যায়ে যাদের অবদান স্বীকার করতে হবে তাদের মধ্যে এমিলিন পাঙ্ঘরস্ট,উইল হেলমিনা ড্রুকার, লুক্রেশিয়া মট, এলিযাবেথ ক্যাডি স্টানটোন, সুসান বি এন্থনি প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় তরঙ্গ :প্রথম তরঙ্গে কিছু দেশে ভোটাধিকার অর্জিত হলেও ইউরোপের অনেক দেশে তখনো নারীদের ভোটাধিকার অর্জিত হয়নি এই প্রেক্ষিতে আন্দোলন দ্বিতীয় তরঙ্গে উন্নীত হয়।ফলে ১৯৭১ সালে সুইজারল্যান্ডে নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়, লিচেনেস্টাইনে ভোটাধিকার দিতে গণভোটের আয়োজন পর্যন্ত করতে হয় অবশেষে ১৯৮৪ সালে লিচেনেস্টাইনের নারীরা ভোটদানের অধিকার পান। ১৯৬৫ সালের পূর্বে ফ্রান্সের বিবাহিত নারীরা স্বামীর অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে যোগ দিতে পারতেন না,স্বামী কর্তৃক ধর্ষণ বা বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে দেখা হতো না এসব তুলে নিতে পারিবারিক আইনের সংশোধন করাতে বাধ্য করেন তখনকার নারী অধিকার কর্মীরা। এ পর্যায়ের সফলতার জন্য যাদের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন তাদের মধ্যে বেল হুক্স তৃতীয় তরঙ্গ : ১৯৯০ পরবর্তী সময় তৃতীয় তরঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত।এ সময় সেক্সুয়্যালিটিকে নারী ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, নারীর স্বতন্ত্রতা,সেক্সুয়্যালিটি, হেটারোসেক্সুয়্যালিটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।এসব প্রশ্নের মূলোৎপাটনে এ পর্যায়ের নারীবাদীদের ভুমিকা রয়েছে। এসময় আরেকটা ব্যপার দৃষ্টিগোচর হয় যে,পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারী নিপীড়নের একমাত্র কারণ নয় ঔপনিবেশিক শাসনও জড়িত এখানে।পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর হাতে তৃতীয় বিশ্বের নারীরা বর্ণগত, শ্রেণীগত,নৃগোষ্ঠীগতভাবে কোণঠাসা হয়।ফলে তৃতীয় বিশ্বের পিছিয়ে পড়া নারীমুক্তি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে সামনে আসে। এ পর্যায়ে যাদের অবদান স্বীকার করতে হবে তাদের মধ্যে গ্লোরিয়া অ্যাযাল্ডা,সেলা স্যান্ডোভাল, চেরী মোগারা, অ্যাড্রে লর্ড, ম্যক্সিন হং কিংস্টন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমান সময়ে মুলধারার নারীবাদের পাশাপাশি উগ্র নারীবাদ বা রেডিক্যাল ফেমিনিজম এর বিস্তার ঘটছে ।চলুন সংক্ষেপে জেনে নিই এ সম্পর্কে উগ্র নারীবাদ : নারীবাদের এ ধারা মনে করে,সমাজ থেকে পুরুষতন্ত্রের মূলোৎপাটন করতে হবে এবং সমাজের সর্বত্র নারীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু এটা উদারনৈতিক নারীবাদের সাথে সাংঘর্ষিক,মুলধারার নারীবাদ যেখানে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পক্ষপাতি সেখানে উগ্র নারীবাদ অবাস্তব বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। উগ্র নারীবাদের আদর্শগত কিছু দিক দেখে নেওয়া যাক ১. সন্তান জন্মদানের অধিকার শুধুমাত্র মায়ের ২.তীব্র পুরুষ বিদ্বেষ এবং নারীদের লেসবিয়ান হতে উৎসাহ দেওয়া ৩.সন্তান জন্মদানের টুল হিসেবে নারীর বিকল্প খোঁজ করা ৪. ছেলেশিশু জন্মদানে অনীহা ৫. পুরুষের স্বাভাবিক পুরুষত্ব বিলোপ করতে উদ্ধত হওয়া র্যাডিকাল ফেমিনিজম এর সাথে লিবারাল ফেমিনিজমকে মেলানো যাবে না।অনেকে মনে করছ, উগ্র নারীবাদ উদারনৈতিক নারীবাদকে বিতর্কিত করার জন্য দায়ী।যদিও উদারনৈতিক নারীবাদের সাথে উগ্র নারীবাদের আদর্শগত মিল নেই। পশ্চিমের উত্তর আধুনিক সমাজের কিছু অংশে র্যাডিকাল ফেমিনিজমের গ্রহনযোগ্যতা থাকলেও বিশ্বের অনেক সমাজব্যবস্থার সাথে এই ধারাটি সাংঘর্ষিক।কিছু সমাজে এখনো এর গ্রহনযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন।এক্ষেত্রে সময় বলে দেবে র্যাডিকাল ফেমিনিজম গ্রহনযোগ্যতা পাবে কি? অথবা না? তবে নারী মুক্তির জন্য উদার নারীবাদ একটি চমৎকার ধারণা। ভবিষ্যতের সমাজকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন দিকটা গ্রহন করতে সক্ষম।

বাংলাদেশ জমিন/ সংবাদটি শেয়ার করুন


Copyright (c) 2019-2026 bzamin24.com