ভিডিওকাণ্ডে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বহিষ্কারের তথ্য দল থেকে নির্বাচন কমিশনে জানানো হবে।
আজ বুধবার দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বার্তায় এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এবার প্রশ্ন উঠেছে দলের হয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কার হলে তার এমপি পদের কী হবে। তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কি না, তা নিয়েও চলছে আলোচনা।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদে আসন শূন্য হওয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, কোনো দল থেকে মনোনীত কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ বা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে।
তবে দল থেকে বহিষ্কার হলে আসন শূন্য বা সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কথা উল্লেখ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দলীয় বহিষ্কার বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই।
তবে ফৌজদারি মামলায় তিনি যদি এমনভাবে দণ্ডিত হন, যাতে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তখন বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন নাসে বিষয়ে বলা হয়েছে। এর একাংশে উল্লেখ আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে ওই ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন।
এদিকে জামায়াত বহিষ্কার বার্তায় বলেছে, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে কোনো পক্ষ থেকে মামলা হয়নি।
দলের বহিষ্কারাদেশে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তাদের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনেও দলের পক্ষ থেকে জানানো হবে। তিনি যদি অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে আদালত সেটি দেখবে। এরপর ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন।
ভিডিওকাণ্ড
সোমবার রাত থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর নামের একটি ফেসবুক আইডিতে প্রথম একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর কয়েকটি অংশে দেখা যায়, ওই তরুণীর সঙ্গে নজরুল ইসলাম একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। সেখানে তাদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়।
নজরুলের দাবি, দ্বিতীয় স্ত্রী
ওই তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল। তার প্রথম পক্ষের স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের দাবিওই তরুণীর সঙ্গে এমপির বৈবাহিক সম্পর্ক রয়েছে। মেয়েটির বাবাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর গাজী নজরুল ইসলামের দলীয় মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। এরপর গতকাল মঙ্গলবার এক লিখিত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, পারিবারিকভাবে চলতি বছরের ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
মগবাজারে যা হয়েছে
গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাছুম বিল্লাহকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে শ্বশুরের ব্যাবসায়িক কার্যালয়ে যান।
সেখানে অবস্থানকালে তার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে তাদের জিম্মি করেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরে আরো কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাছুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত গোপনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই ভিডিওকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
পাঁচ দিন পরের বায়োডাটায় অবিবাহিত
তবে বিয়ের দাবির মধ্যেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে মরিয়ম খাতুনের একটি বায়োডাটা। ওই বায়োডাটায় দেখা যায়, চলতি বছরের ২২ জুন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সই রয়েছে। সইয়ের ওপরে সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে জোর সুপারিশ করছি। কিন্তু একই বায়োডাটার ব্যক্তিগত তথ্য অংশে Marital Status-এ লেখা রয়েছে Unmarried (অবিবাহিত)।
গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী, মরিয়ম খাতুন এবং মরিয়মের বাবার বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের বিয়ে হয়েছে ১৭ জুন। কিন্তু বিয়ের দাবি করা তারিখের পাঁচ দিন পর এমপির সই করা বায়োডাটায় কেন মরিয়মকে অবিবাহিত উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলাম কিংবা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি
গাজী নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামীর শূরা সদস্য। ত্রয়োদশ সংসদ সদস্য নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসনে তাকে মনোনয়ন দেয় জামায়াত। ১৩ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। এর আগে তিনি ১৯৯১ ও ২০০১ সালে একই আসন থেকে জামায়াতের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অবাঞ্ছিত ঘোষণা
সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আজ বুধবার গাজী নজরুলের নির্বাচিত এলাকায় (শ্যামনগর) মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজএর ব্যানারে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচি থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে উপজেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল ও তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপজেলা বিএনপির সদস্য আশেক-ই-এলাহী বলেন, এ ঘটনায় শ্যামনগরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা প্রমাণিত হলে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় সংসদ সদস্যের এই ভিডিওকাণ্ডে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। এসব কর্মসূচি থেকেও গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।