যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা থাকলেও মার্কিন হুমকির মুখে তা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মার্কিন হুমকি অব্যাহত থাকলে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ ইরানি সমবেত হচ্ছেন। কোনো হুমকিতে তারা বা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকেউই পিছু হটবে না। ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা আপনাদের স্বাক্ষরকে সম্মান করুন।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক উসকানিমূলক বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, অথবা তাদের শেষ করে দেবে।
সোমবার(৬ জুলাই) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের সেতুগুলো ভেঙে ফেলতে পারি। আমরা তাদের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারি। তাদের কাছে এখন কোনো টাকা নেই।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার মধ্যরাতের এই হামলায় কাতার গ্যাসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নাকিলাতের মালিকানাধীন এলএনজি ট্যাংকার আল রেকায়াতসহ দুটি জাহাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনটি আল রেকায়াতের ইঞ্জিন রুমে আঘাত হানলে সেখানে আগুন ধরে যায়। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে নির্দেশনা অমান্যকারী জাহাজগুলোতে ড্রহের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আইআরজিসি।
যদিও গত ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিলেন, সেখানে ইরান এই প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।
মেরিনট্র্যাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রণালিটিতে অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার বেশির ভাগের জন্যই তেহরানকে দায়ী করা হয়। সমঝোতা চুক্তির পর নৌপথে পারাপার কিছুটা বাড়লেও তা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখনো অনেক কম।
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ আগ্রাসী মন্তব্যের বিপরীতে ইরান পাল্টা মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। একদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা ও কূটনৈতিক মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাকফুটে ফেলার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির এই হামলাকে তেহরানের পাওয়ার প্রজেকশন বা শক্তির মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরান যে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েনি এবং যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে নিজেদের শর্ত ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে সামরিক পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করবে না, হরমুজের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তারই প্রমাণ।