বার্সেলোনাতেই থাকছেন মেসি

  • ডেস্ক
  • শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১১:৫৩:০০

তাও আবার কোনো ট্রান্সফার ফি ছাড়াই। সপ্তাহ খানেক এই নাটক চলার পর গতকাল  আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস নিশ্চিত করেছে, বর্তমান চুক্তি অনুসারে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ন্যু ক্যাম্পে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। বার্সেলোনায় থাকার বিষয়ে কাতালান ক্লাবটির কাছে এক বিবৃতি পাঠিয়েছেন মেসি। তবে সেই বিবৃতিতে তিনি কী বলেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। টিওয়াইসি স্পোর্টস জানিয়েছে, আইনি ঝামেলা এড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত ছয়বারের বর্ষসেরা ফুটবলারের।

লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার ঘোষণা দিতে পারেন; এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল চ্যাম্পিয়ন্স লীগে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ৮-২ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পরই।

আর ২৫শে আগস্ট ব্যুরোফ্যাক্সের মাধ্যমে বার্সেলোনাকে মেসি জানান, ন্যু ক্যাম্পে আর থাকবেন না। তোলপাড় পড়ে যায় ফুটবল দুনিয়ায়।  মেসিকে ভেড়ানোর দৌড়ে নেমে পড়ে ম্যানচেস্টার সিটি, প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি), জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাব। একসময়ের ক্লাব সতীর্থ নেইমারও মেসির সঙ্গে ফোনালাপে পিএসজিতে জুটি বাঁধার আমন্ত্রণ জানান। পাঁচ বছরের জন্য ৭০ কোটি ইউরোর প্রস্তাব দেয় ম্যান সিটি। ম্যানচেস্টারের আকাশী-নীলদের প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। তবে বাধ সাধে বার্সেলোনা। যেকোনো মূল্যে ক্লাব ইতিহাসের সেরা ফুটবলারকে ধরে রাখার পণ করে তারা। মেসিও ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। বার্সা সভাপতি হোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ আলোচনার প্রস্তাব দিলে রাজি হননি মেসি। বেঁকে বসে কাতালান জায়ান্টরাও। ঘোষণা দেয়, রিলিজ ক্লজের ৭০ কোটি ইউরো (প্রায় ৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা) পরিশোধ না করে বার্সেলোনা ছাড়তে পারবেন না মেসি। ছয়বারের বর্ষসেরা ফুটবলার তখন সমঝোতার জন্য বার্সেলোনার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে চান। মেসির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বার্সেলোনা জানিয়ে দেয়, ‘নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে চাইলেই বৈঠকে বসতে রাজি তারা।’

মেসির সঙ্গে বার্সেলোনার অঘোষিত এই ‘যুদ্ধের’ মূল বিষয় ছিল ৭০ কোটি ইউরোর রিলিজ ক্লজ। ২০১৭ সালে মেসির সঙ্গে বার্সেলোনার সর্বশেষ চুক্তিতে এই মূল্য নির্ধারিত হয়। তবে এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় বিশেষ শর্ত- চাইলেই মৌসুম শেষে মেসি অন্য ক্লাবে যোগ দিতে পারেন। সেজন্য মেসিকে ক্লাব ছাড়ার ঘোষণা দিতে হবে ১০ই জুনের মধ্যে। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে ২০১৯-২০ মৌসুম শেষ হয় আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে। মেসির আইনজীবীদের দাবি ছিল, ২০১৯-২০ মৌসুম শেষ হতে দেরি হওয়ায় মেসির ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানানোর সময়টাও তাই পিছিয়েছে। বার্সেলোনা সেসব যুক্তি আমলে নেয়নি। মেসিকে আটকাতে ৭০ কোটি ইউরো রিলিজ ক্লজের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে তারা। মেসির ট্রান্সফার ফি নিয়ে বার্সেলোনার সমর্থনে বিবৃতি দেয় লা লিগা কর্তৃপক্ষও। সাধারণত কোনো খেলোয়াড়ের ক্লাব ছাড়ার বিষয়ে লীগ কর্তৃপক্ষকে মন্তব্য করতে দেখা যায় না। কিন্তু মেসির মতো সর্বকালের সেরাদের কেন হারাতে চাইবে লা লিগা? তারাও বার্সেলোনার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিবৃতি দেয়, ফ্রিতে নয়, ৭০ কোটি রিলিজের বিনিময়েই মেসিকে ক্লাব বদল করতে হবে।
এদিকে ক্লাব ছাড়ার ঘোষণার পর নিজেকে বার্সেলোনার খেলোয়াড় মনে না করায় মেসি ৩০শে আগস্টের কভিড-১৯ টেস্ট করাননি। আসেননি ২০২০-২১ মৌসুমের অনুশীলন ক্যাম্প শুরুর প্রথম দিনেও। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বার্সেলোনার খেলোয়াড় হওয়ায় মোটা অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়েন তিনি। দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সমাধানের পথ খুঁজতে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। মেসি-বার্সা দ্বন্দ্বের ইতি টানতে ১লা সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনা থেকে চাটার্ড বিমানে স্পেনে উড়ে আসেন লিওনেল মেসির বাবা ও এজেন্ট হোর্হে মেসি। পরদিনই বার্সেলোনা সভাপতির সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি। কিন্তু আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এরপর হঠাৎ মেসির ‘ইউ-টার্ন’। গত বৃহস্পতিবার বাবা হোর্হে মেসি, ভাই ও পরামর্শক রদ্রিগো মেসির সঙ্গে নিজের ভবিষ্যত নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠকে বসেন তিনি। তার আগেই অবশ্য আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম জানিয়ে দেয় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বার্সেলোনায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেসি।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর লিওনেল মেসিও যদি অন্য লীগে চলে যেতেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই জৌলুশ হারাতো স্প্যানিশ লা লিগা। আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতো স্পেনের শীর্ষ লীগটি। কিন্তু মেসি কেন বার্সেলোনার সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন? কাতালানদের সঙ্গে মেসির দূরত্বের শুরুটা ২০১৪ সালে হোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই। ক্লাবের সঙ্গে নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকতো মেসি ও অন্যান্য সিনিয়র ফুটবলারদের। যার চূড়ান্ত রূপ পায় ২০১৮ সালে নেইমার বার্সেলোনা ছেড়ে গেলে। ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারকে বিক্রি করে পাওয়া ২২২ মিলিয়ন ইউরোর ‘সঠিক’ ব্যবহার হয়নি বলে মনে করেন মেসি। এছাড়া ক্লাবের ভবিষ্যত পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা নিয়ে তখনকার ক্রীড়া পরিচালক ও এক সময়ের সতীর্থ এরিক আবিদালের সঙ্গে প্রকাশ্যেই দ্বন্দ্বে জড়ান মেসি। গত মার্চে করোনা মহামারির কারণে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় বার্সেলোনা। তখন কাতালান জায়ান্টরা জানায়, ‘মেসি সহ কয়েকজন সিনিয়র ফুটবলার বেতন কমাতে রাজি নন।’ এমন খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেসি। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘বেতন কমাবেন না এমন কথা তিনি বা সতীর্থদের কেউই বলেননি।’ এর্নেস্তো ভালভার্দেকে বরখাস্ত করা নিয়েও বার্সেলোনা বোর্ডের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় মেসির। কিকে সেতিয়েনের অধীনে বার্সেলোনা ২০০৭-০৮ মৌসুমের পর ট্রফিহীন মৌসুম শেষ করে। বার্সেলোনার সঙ্গে লিওনেল মেসির চুক্তি আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। তার আগেই সভাপতি পদে নির্বাচন হবে। নিয়ম অনুয়ায়ী সেই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না বার্তোমেউ। নানা কারণে দূরত্ব বাড়ায় গত কয়েক বছর থেকেই সভপতির প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন মেসি। সভাপতি পদে নির্বাচনের পর বদলে যাওয়া বার্সেলোনায় ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত হয়তো থেকেও যেতে পারেন মেসি- এ কথা তিনি যে বলেছেন একাধিকবার। বার্তোমেউয়ের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ ছিল মেসিসহ বার্সেলোনার বর্তমান-সাবেক সুপারস্টারদের বিপক্ষে কুৎসা রটনা করেন তিনি। সবকিছু মিলিয়ে অসুখী হয়ে উঠেছিলেন মেসি। যেতে চেয়েছিলেন নতুন ঠিকানায়। ৭০ কোটি ইউরো রিলিজ ক্লজের কারণে পারলেন না। তবে সংবাদমাধ্যমের দাবি, আগামী মৌসুমে আর বার্সেলোনায় থাকবেন না মেসি। কিন্তু কাতালান ক্লাবটি যদি নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যানের অধীনে ছন্দ খুঁজে পায়, তখন কী করবেন মেসি?

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য