বেলকনিতেও ঠাই হলো না বৃদ্ধা মায়ের রাস্তায় ফেলে গেল মেয়ে

  • ওয়াহিদ মুরাদ, মাদারীপুর:
  • শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ১২:৪৬:০০

ঢাকার নিজের বাসা থেকে এনে মাদারীপুরের শিবচরে ৯০ উর্ধ্ব বছর বয়সী বৃদ্ধা মাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে দিয়ে চলে গেছে মেয়ে পার্বত্য রানী মন্ডল।  এক ভ্যান চালকের সহায়তায় অবশেষে এক নাতনীর বাড়িতে আশ্রয় হয়েছে সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধা সাম্প্রীয় বৈরাগীর।

বৃদ্ধা সাম্প্রীয় বৈরাগী ও তার পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, শিবচর উপজেলার শিরুয়াইল ইউনিয়নের সাদেকাবাদ গ্রামের মৃত্যু রাজমোহন বৈরাগীর স্ত্রী সাম্প্রীয় বৈরাগী। স্ত্রী সাম্প্রীয় বৈরাগী, মেয়ে পার্বতী, স্বরসতী, ছেলে কুমোদ বৈরাগী, স্বত্ব বৈরাগী ও নিত্য বৈরাগীকে রেখে গত প্রায় ৩০ বছর আগে রাজমোহন বৈরাগীর মৃত্যু হয়।  

সেই থেকে ২ মেয়ে ও ৩ ছেলেকে নিয়েই ছিলেন সাম্প্রীয় বৈরাগী। ৩ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে কুমোদ বৈরাগী গত প্রায় ১৯ বছর আগে মারা যায়। মেঝো ছেলে স্বত্ব বৈরাগী কিডনী রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছেন। ঢাকাতে স্ত্রীর উপার্জনের টাকায় কোনমতে চিকিৎসা চলছে তার। 

ছোট ছেলে নিত্য বৈরাগী কোলকাতায় পাড়ি দিয়ে নিরুদ্দেশ আছে অনেক বছর যাবত।  ছোট মেয়ে স্বরসতী বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সাথে কোলকাতায় আছেন। তার সাথেও পরিবারের তেমন যোগাযোগ নেই। আর সাম্প্রীয় বৈরাগীর বড় মেয়ে পার্বতী মন্ডল ঢাকার আগার গাও থানার তালুকদার রোড এলাকার চতুর্থ তলার একটি ফ্লাটে স্বামীর সাথে বসবাস করেন। তার স্বামী দিনা মন্ডলের রয়েছে লোহার গ্রীলের ব্যবসা। 

গত প্রায় ৪ বছর আগে পার্বতী তার মা সাম্প্রীয় বৈরাগীকে নিজের কাছে রাখার জন্য গ্রামের বাড়ি সাদেকাবাদ থেকে ঢাকায় নিয়ে যায়। প্রথম অবস্থায় মেয়ের বাসায় সুখ ও শান্তিতেই ছিলেন সাম্প্রীয় বৈরাগী। তবে করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে বৃদ্ধা মাকে ঘর থেকে সরিয়ে বাসার বেলকনির খালি জায়গায় রাখতে শুরু করে মেয়ে পার্বতী ও তার পরিবার। 

বেলকনিতেই তাকে খাবারও দেওয়া হতো। চোখের জলে খেয়ে না খেয়ে বেলকনিতেই দিন পার করছিলেন বৃদ্ধা সাম্প্রীয়। তবে এতেও যেন বোঝা হালকা হচ্ছিল না মেয়ে পার্বতীর। তাই গত ১৮ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার মেয়ে পার্বতী মন্ডল ঢাকা থেকে একটি গাড়িতে করে বৃদ্ধা মা সাম্প্রীয় বৈরাগীকে গ্রামের বাড়ি শিবচরের সাদেকাবাদ এলাকায় নিয়ে এসে ঐ এলাকার একটি কাঁচা রাস্তার পাশে মাকে ফেলে রেখে দিয়ে ঢাকায় ফিরে যায়। 

রাস্তার পাশে পড়ে কাঁদছিল অসহায় সাম্প্রীয়।  পরে সন্ধার দিক স্থানীয় এক ভ্যান চালক আনোয়ার মিয়া তাকে দেখতে পেয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে বৃদ্ধা সাম্প্রীয় মাদবরচর ইউনিয়নের ডাইয়ারচর গ্রামের তার বড় ছেলের মেয়ে নাতনী রিতা রানী মন্ডলের শশুর বাড়ির কথা বলে। পরের দিন শুক্রবার ভ্যান চালক আনোয়ার বৃদ্ধা সাম্প্রীয়কে তার নাতিন জামাই ডাইয়ারচর গ্রামের দয়াল মন্ডলের ছেলে জগদীশ মন্ডলের বাড়িতে পৌছে দেয়। সেখানেই নাতনির আশ্রয়ে আছেন সাম্প্রীয় বৈরাগী।

ভ্যান চালক আনোয়ার মিয়া বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাদেকাবাদ রাস্তার পাশে মায়ের বয়সী বৃদ্ধাকে পড়ে থাকতে দেখে অসুস্থ্য অবস্থায় উদ্ধার করে আমার বাড়ীতে নিয়ে যাই। সে তার নিকটতম এক আত্মীয় মাদবর চর ইউনিয়নের ডাইয়ার চর গ্রামের দয়াল মন্ডলের ছেলে জগনাথ মন্ডলের কথা বলে। তাই শুক্রবার সকালে আমি তাকে তার আত্মীয়য়ের বাসায় পৌছে দেই।

বৃদ্ধার নাতিন জামাই জগদীশ মন্ডল বলেন, পৃথিবীতে সন্তান দেখেছি। এত নিষ্ঠুর সন্তান কোথাও দেখিনি। প্রায় শতবর্ষী বৃদ্ধা মাকে কিভাবে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে গেল। এটা আমি বুঝে উঠতে পারছি না।

বৃদ্ধার নাতনী রিতা রানী মন্ডল বলেন, নিজের বয়স্ক ভাতার টাকা উত্তোলন করে আমার দাদী তার এই মেয়েকে দিয়েছে। সেই মেয়ে মাকে নিজের বাসায় নিয়ে অনেক কষ্ট দিয়েছে। যদি নিজের মায়ের ভরন পোষনের এতই কষ্ট হচ্ছিল তাহলে আমার বাড়িতে রেখে গেলেও পারতো। তা না করে রাস্তায় ফেলে গেলো কেন? আমি এর বিচার চাই।

সাম্প্রীয় বৈরাগী বলেন, অনেক আগেই চোখের জল ফুরিয়ে গেছে। এখন আর কান্না করার শক্তি নেই। মেয়ের বাসায় চার বছর ধরে ছিলাম। করোনার পর থেকে ফ্লাটের খোলা বেলকনিতে থাকতে হয়েছে। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে রাত জেগে একা একা কান্না করেছি।  আমার পেটের মেয়ে আমাকে গাড়িতে করে তুলে এনে রাস্তার পাশে এভাবে ফেলে যাবে কখনো বুঝে উঠতে পারিনি।  তবুও চাই ওরা সুখে থাকুক।

বৃদ্ধার মেয়ে পার্বতী মন্ডলের স্বামী দিনা মন্ডলের মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে কথা না বলেই ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন দিলেও সে আর রিসিভ করেনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য